অভিশপ্ত কুরুসভা: দ্রৌপদীর রক্ত ও সমাজের মৌনতা
কুরুসভার সেই অভিশপ্ত প্রহর, স্তম্ভিত বাতাস,
সিংহাসনে বসা মহাবীরদের মুখে কেবল ভীরু দীর্ঘশ্বাস।
পিতা মহ ভীষ্মের ধুলিস্যাত জ্ঞান, আর দ্রোণের নিরব ভক্তি—
একটি মেয়ের সম্মান বাঁচাতে কি সেদিন ফুরিয়েছিল সব শক্তি?
দুঃশাসনের রক্তমাখা হাত, আর দ্রৌপদীর কেশে সেই পৈশাচিক টান,
সভামধ্যে তখন উল্লাসে ফেটে পড়েছিল কিছু কামাতুর প্রাণ।
চুল মুঠি ধরে যখন হিড়হিড় করে টেনে আনা হলো রাজরাণীকে,
পাঞ্চালীর তপ্ত চোখের জল কি তখন কাঁপায়নি বিশ্বজোড়া ধর্মকে?
লুটিয়ে পড়ল পাণ্ডবদের মস্তক, নপুংসক হলো তাদের সব তেজ,
বস্ত্রহরণের উন্মাদনায় সেদিন রচিত হলো এক কলঙ্কিত শেষ।
সেই কলঙ্কিত শাড়ি আজও ফুরোয়নি, আজও বাড়ছে তার দৈর্ঘ্য,
আজও আমরা নারীদেহে খুঁজি লুণ্ঠনের মারণ-ঐশ্বর্য।
দ্রৌপদীর চুলে আজও টান পড়ে লোকাল বাসের ভিড়ে কিম্বা রাজপথে,
আজকের দুঃশাসনেরা অট্টহাসি হাসে ক্ষমতার উল্কারথে।
সেদিন কৃষ্ণ ছিল, অলৌকিক বসনে ঢাকা পড়েছিল অপমান,
আজকের দ্রৌপদীর আর্তনাদে আকাশ ফাটলেও, ফেরে না তো প্রাণ।
সভ্যতা আজ মুখোশ পরেছে, কিন্তু হায়নার নখ আরও হয়েছে ধারালো,
যে মেয়েটি আলো চাইত, আঁধারের গ্রাস কি তবে তাকেই মারল?
কুরুবৃদ্ধেরা আজও বসে আছে— প্রশাসন, আদালত আর ক্ষমতার ঘরে,
একটি প্রাণের বিনিময়ে কেবলই আইনের ফাইল নড়ে আর চড়ে।
মহারথী পাণ্ডবেরা আজও নির্বাক, ধর্মের অজুহাতে তারা আজও মৌন-পাথারে,
আর দ্রৌপদীর তপ্ত অশ্রু আজও মিশে যায় ইতিহাসের এই অন্ধকারে।
যতদিন না এই পাষাণ সমাজ ভাঙবে শৃঙ্খল, পুড়বে না লোলুপ কামনার বিষ,
ততদিন মহাকালের বিচারালয়ে প্রতিধ্বনিত হবে দ্রৌপদীর সেই অভিশ।
— লেখনীতে: স্নেহা ঘণ্টেশ্বরী
স্বপ্নভঙ্গের শিলালিপি
স্কুলবেলার সেই শেষ বেঞ্চ থেকে শুরু হয়েছিল এক বুক স্বপ্ন বোনা,
এসএসসি-র ওই একটা সুযোগ— ভেবেছিলাম ঘুচবে জীবনের সব দেনা-পাওনা।
বাবার ভাঙা চশমা, মায়ের জমানো আশা আর কত বিনিদ্র রাত,
সবটুকু বাজি রেখে লড়েছিলাম আমরা, চেয়েছিলাম শুধু একটু সুপ্রভাত।
ষাট নম্বরের সেই মরণপণ যুদ্ধে মেধা ছিল আমাদের একমাত্র হাতিয়ার,
তিল তিল করে পঞ্চান্ন গড়েছি— সেখানে ছিল না কোনো মিথ্যে বা ছায়ার কারবার।
অথচ আজ ইতিহাসের পাতায় এক বীভৎস উপহাসের নিষ্ঠুর আয়োজন,
পঞ্চান্ন যেখানে ব্রাত্য আজ, সতেরোর সেখানে রাজকীয় নিমন্ত্রণ।
আমরা যারা ‘সাধারণ’, আমাদের ললাটে কি তবে বঞ্চনার চিরস্থায়ী তিলক?
যোগ্যতা যেখানে অভিশাপ, সেখানে মেধাও আজ বড় ম্লান, নিঃস্ব পালক।
স্কুলের সেই জীর্ণ ক্লাসরুমে দেখা স্বপ্নগুলো আজ মরা লাশের মতো পড়ে,
রক্ত জল করা পঞ্চান্নর তবে কি কোনোই দাম নেই এই অন্ধ শহরের ঘরে?
সতেরো পাওয়া স্পর্ধিত হাসিরা আজ যোগ্যতার কফিনে ঠুকছে শেষ পেরেক,
সিস্টেমের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে গুমরে কাঁদছে হাজারো যোগ্য বিবেক।
জন্মপরিচয় যদি হয় মানদণ্ড, তবে কেন এই শিক্ষার বৃথা আড়ম্বর?
কেন তবে মেধাকে পুড়িয়ে চলেছো প্রতিদিন? কেন এই বৈষম্যের অনড় পাথর?
আমরা তো অন্ন চাইনি, চেয়েছিলাম লড়বার সমতলের এক চিলতে জমি,
কেন তবে আমাদের স্বপ্নের আকাশে আজ বঞ্চনার মেঘের ঘন অষ্টমী?
এসএসসি-র সেই খাতাগুলো আজ বিচার চাইছে সময়ের দরবারে একা—
পঞ্চান্নর কি তবে কোনো মূল্য নেই? শুধুই কি সতেরোর ভাগ্যফল লেখা?
সাক্ষী থাকুক মহাকাল, সাক্ষী থাকুক এই ধ্বংসোন্মুখ সমাজ ব্যবস্থা,
স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটিয়ে যেখানে চলছে অন্যায়ের এক আদিম নিষ্ঠুর আস্থা।
পঞ্চান্নর আর্তনাদ আজ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দিচ্ছে নীরব ধিক্কার—
মেধা যেখানে সস্তা দরে নিলাম হয়, সেই সমাজই তো আসল অন্ধকার।
লেখনীতে: স্নেহা ঘণ্টেশ্বরী

