Author: সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
Email: No Email
নিয়ন আলোর অন্ধকারে
=================
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
বিকেলের আলো সরে আঁধার নেমে এলো। নিয়ন আলোগুলো সবে জ্বলতে শুরু করেছে। প্রতিদিনের চেনা পথ ধরে ঋভু বাসার দিকে এগিয়ে চলল। ঠিক তখনই ছোট্ট এক শিশুকে দেখে তার চোখ আটকে গেল। এই শিশুটির বয়স কতই-বা হবে? পাঁচ কি ছয় বছর। পরনে ছেঁড়া প্যান্ট, হাতে একগোছা লাল গোলাপ। একটু আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে; ফুলের পাপড়িগুলোতে পানির ফোঁটা চকচক করছে। কিন্তু শিশুটির চোখের জল যেন সেই পানির ফোঁটাকেও হার মানায়। সে এক পথচারীর পেছন পেছন ছুটছে, "মামা, ও মামা, একটা ফুল নেন। মাত্র দশ টাকা।" পথচারী ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে হাত নাড়লেন। এক ঝটকায় সরিয়ে দিলেন তাকে। শিশুটি ছিটকে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিল। কিন্তু ওর মুখে কোনো রাগ নেই; যেন এটাই স্বাভাবিক। ঋভুর বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। এই শহরে এই শিশুদের কোনো নির্দিষ্ট ঘর নেই, পরিচয় নেই। যারাই সামনে আসে, সবাই তাদের 'মামা'। সবাই আপন, অথচ কেউ তাদের নিজের নয়। পিতৃপরিচয়হীন, ঠিকানাহীন এক ঝাঁক মেঘের মতো এরা ভেসে বেড়াচ্ছে রাজপথে। "মামা, একটা ফুল নেন না?" হঠাৎ নরম একটা স্পর্শ ঋভুর হাতের ওপর। তাকিয়ে দেখল, সেই শিশুটিই। বড় বড় দুটো চোখ তুলে তাকিয়ে আছে। ঋভু পকেটে হাত দিল। একটা দশ টাকার নোট বের করে শিশুটির হাতে দিল। ফুলটা ও হাত বাড়িয়ে নিতেই শিশুটি একগাল হাসল। সেই হাসিতে কোনো মলিনতা নেই; পৃথিবীর সমস্ত আলো যেন ওই ছোট্ট মুখে এসে পড়েছে। " নাম কী তোর?" ঋভু নরম গলায় জিজ্ঞেস করল। "নেহা," বলেই শিশুটি আবার উল্টো দিকে দৌড় দিল। আরেকজন পথচারীকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল, "মামা, নেন না! দশ টাকা!" ঋভু হাতের গোলাপটার দিকে তাকাল। কাঁটাগুলো ওর আঙুলে বিঁধছে না, কিন্তু বুকের ভেতর তীব্র ব্যথা খামচে ধরেছে। সে নেহার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই চোখ পড়ল একটু দূরের অন্ধকারের দিকে। সেখানে এক লোক দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। নেহা দৌড়ে গিয়ে দশ টাকার নোটটি ওই লোকের হাতে তুলে দিল। লোকটি এক ঝটকায় টাকাটা কেড়ে নিয়ে নেহার গালে শক্ত একটা চড় মারল—হয়তো আরও বেশি ফুল বিক্রি করতে না পারার অপরাধে। নেহা গাল ডলতে ডলতে আবার নতুন পথচারীর খোঁজে দৌড় দিল। ঠিক তখনই ঋভুর হাতের গোলাপটি কাঁপতে লাগল, যেন অবহেলায় ঝরে পড়া পাপড়িগুলো থেকে কোনো এক শিশুর না-বলা কান্নার রক্ত ঝরছে।
০২ আগষ্ট ২০২৬ইং