শ্রাবণের শেষ চিঠি


Author: জিয়াউর রহমান শিলন

Email: No Email


শ্রাবণের শেষ চিঠি

জানালার কাচ বেয়ে অঝোর ধারায় গড়িয়ে পড়ছে শ্রাবণের জল। আগস্টের এই চেনা বিকেলটায় হঠাৎ করেই কলকাতার আকাশটা ভেঙে পড়েছে। বাইরে গড়িয়াহাটের মোড়ে গাড়িগুলোর লাল-হলুদ আলো জলের ঝাপসায় আবছা দেখাচ্ছে।

টিনের চালের ঘরে বৃষ্টির শব্দ একরকম, আর এই আধুনিক বহুতল ফ্ল্যাটের অ্যালুমিনিয়াম উইন্ডোর কাচে বৃষ্টির ধাক্কা আরেক রকম। সৌভিকের হাত শান্তভাবে চেপে ধরেছিল এক কাপ গরম দার্জিলিং চা। তবে মনটা পড়েছিল বহু দূরে, উত্তরবঙ্গের এক ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে—যেখানে শ্রাবণ নামলে তিস্তা ফুঁসে ওঠে, আর পাইন গাছের পাতা বেয়ে একটানা বৃষ্টির শব্দে সময় যেন থমকে থাকে।

ল্যাপটপের স্ক্রিনে অফিসের হাজারটা মেইলের নোটিফিকেশন ভাসছিল। কিন্তু আজ কোনো কাজে মন বসছিল না। টেবিলের কোণে পড়ে থাকা ডায়েরিটার দিকে চোখ গেল সৌভিকের। গত বছর এই শ্রাবণের মেঘলা দিনেই শেষবার নীলার সাথে দেখা হয়েছিল। ভিক্টোরিয়ার পেছনের গাছতলায় দাঁড়িয়ে দুজন একটা ছাতায় মাথা গুঁজে ভিজেছিল দুজনে।

নীলা বলত, "জানিস সৌভিক, শ্রাবণ মাসের এই জল আসলে মেঘেদের জমিয়ে রাখা অজস্র চিঠি। যারা মনের কথা মুখে বলতে পারে না, তাদের হয়ে বৃষ্টি কথা বলে।"

হঠাৎই মোবাইলের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। কোনো ফোন নয়, একটাই সংক্ষিপ্ত মেসেজ—"বৃষ্টির জল কি তোর শহরের কাচগুলোকেও ভিজিয়ে দিচ্ছে? আমাদের সেই শ্রাবণটা কিন্তু আজও আমার ছাতায় জমা আছে।"

মেসেজটা নীলার। পুরো এক বছর পর।

সৌভিক জানালার কাচটা একটানে সরিয়ে দিল। সাথে সাথে সোঁদা গন্ধ আর ঠান্ডা শ্রাবণের ছাঁট এসে মুখে-বুকে লাগল। শহরের ব্যস্ততা, ট্রাফিকের হর্ন আর যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল যেন মুহূর্তের মধ্যে বর্ষার জলে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।

সৌভিক চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে ফোনটা হাতে নিল। টাইপ করল, "ছাতাটা নিয়ে নিচে নামবি? আমাদের শ্রাবণের চিঠিগুলো আজও কিন্তু পড়া বাকি।"

Post a Comment

© Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain