
Author: মোহাম্মাদ মাসিউর রহমান
ছন্নছাড়া: আকাশের সেই নীল ঠিকানা
লেখক: মোহাম্মাদ মাসিউর রহমান
[এক]
পূর্ণগোলাকার শশীটির দিকে চোখ পড়লেই মনে হয়—
আকাশের কোনো রমণী যেন সুদ্ধ গমের রুটি বানিয়ে সেখানে টাঙিয়ে রেখেছে।
পুরো আকাশ কালো চাদরে ঢাকা। সেই চাদরের ফুটো দিয়ে আলো মিটমিট করে ঢুকছে। কৃষ্ণচূড়ার থোকাটি চাঁদকে এক চতুর্থাংশ ঢেকে রেখেছে। লাল রঙের আড়াল থেকে চাঁদের ইন্দুবর্ণ আলো ঝরে পড়ছে—দৃশ্যটা সত্যিই মনকে মন্ত্রমুগ্ধ করে।
পুরোনো জংধরা জানলার শিক।জানলার ধারে একটা কাঠের চেয়ার।সেই চেয়ারে বসে আছে মেয়েটা।
সামনের নীচু টেবিলটিতে পা তুলে রেখে, পিঠ চেয়ারে হেলানো। চুলগুলো চেয়ারের পেছনে ছড়িয়ে আছে। আর দেড় হাত লম্বা হলে হয়তো চুলগুলো মেঝেতে লুটিয়ে থাকত।কালো ওড়না গলায় জড়ানো। পাকিস্তানি কুর্তি পরা।কোলের ওপর খোলা নোটবই।সে দু’লাইন লেখা শেষ করল—
‘ভালোবাসারই ঝরনা ধারায়, রবির কিরণ পড়ে,
সোনালী কেশ ছড়ায় যেন পাহাড় আছে বসে।’
তারপর পাতা উল্টে মনেমনে কিছু আওড়াতে লাগল। শব্দগুলো অস্পষ্ট।
হঠাৎ একটা কন্ঠস্বর ভেসে এলো—
‘জুথি মা, এখনও ঘুমাওনি? এত রাত জাগা ভালো না। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো।’
মেসোর গলার স্বর শুনে তাড়াতাড়ি ওড়না মাথায় তুলল সে। পিছনে ঘুরে মুচকি হেসে বলল—
“হ্যাঁ মেসো, আর একটু। তারপর ঘুমিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি কিছু না বলে ঘরের দিকে চলে গেলেন।জুথি আবার নোটবইয়ে লিখতে শুরু করল।কিছুক্ষণ পর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।নিজের লেখা অস্পষ্টভাবে আওড়াতে আওড়াতে মুচকি হাসল। তারপর ধীরে ধীরে ঘরের দিকে পা বাড়াল।
ঘরের ভিতর হালকা একটা উষ্ণতা অনুভব করলো জুথি। পুরো ঘর অন্ধকারাচ্ছন্ন, তবে জানলা দিয়ে ঢোকা চাঁদের আলোয় আলোকিত ঘরের মেঝে এবং বিছানা। বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে মায়া। চুলগুলো উস্কোখুস্কো হয়ে আছে তার। একটু মুচকি হাসি মায়ার ঠোঁটের কোণে পরিলক্ষিত হলো। ব্যাপারটা জুথি বুঝতে পারলো না।
সে এগিয়ে গেলো মায়ার মাথার কাছে এবং খাটের পাশে থাকা ডেস্ক থেকে দেশলাইয়ের বাক্স তুলে নিলো। দেশলাই কাঠি বারুদে ঘষা লাগতেই মায়ার ও জুথির মুখ ঝলমলিয়ে উঠলো। মায়ার বন্ধ চোখ পিটপিট করে উঠলো।জুথি মোমবাতিটা জ্বালিয়ে মায়ার মুখের সামনে ধরলো এবং ডাক দিলো ‘মায়া... এই মায়া, একটু ওঠ না। আমার কবিতা লেখা শেষ। তুই শুনবি না? এই মায়া ওঠ...!’
মায়া তখন স্বপ্নের রাজ্যে অবস্থান করছে। হাত দিয়ে চোখগুলো ঢেকে নিয়ে বললো
‘উম্ম...! কী হয়েছে তোর? এত রাতে পাগলামি করিস না, ঘুমিয়ে পড়।’
জুথি মুখটাকে আমসত্ত্বের ন্যায় ছোট করে নিলো। সে বুঝলো যে সে আহাম্মক বনে গেছে। তবুও সে এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্রি নয়। আবার ডাকতে লাগলো
‘মায়া... এই মায়া, ওঠ না। বেশিক্ষণ নয়...! কিছুক্ষণই সময় নেবো, তুই ওঠ না।’
এবার মায়া আর সাড়া দিল না। একইভাবে জুথি ডাকতেই থাকলো। অবশেষে মায়া ‘চুক চুক’ শব্দ করে উঠে বসলো এবং গদগদ করে বলতে লাগলো
‘তোর কী কোনো কাজকাম নেই? কী সুন্দর স্বপ্নে আমার রাজপুত্র ঘোড়ায় চড়ে আসছিল, সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে আসছিল। দিলি তো স্বপ্নটাকে ভেঙে!’
জুথি চুলগুলো সামনে থেকে একঝটকায় পিছনে করে, মোমবাতিটা ডেস্কে রেখে হুংকার দিয়ে বলে উঠলো—
‘হ্যাঁ, সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে ঘোড়া তো তোর বাপ চালাচ্ছিল!’
‘দেখ ফাজলামি করিস না। আমার বাপ তো তোর কে হয়? অ্যা...! ভুলে যাস না উনি তোর মেসো।’
‘একটা কবিতা শোনাবো বলে ডাকছি, তো তুই এত কথা শোনাচ্ছিস! দেখিস একদিন তোরা আমার কবিতার বই কিনে কিনে পড়বি। আর খবরের কাগজে আমার অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার খবর ছাপবে। বড় অক্ষরে লেখা থাকবে কবি মাইশা ইসলাম জুথি ।যা... শুনতে হবে না তোকে। তোর পাগল রাজপুত্রের সাথেই কথা বলগা। পাগল একটা! নইলে কেউ সমুদ্রের ওপর দিয়ে ঘোড়া ছোটায়?’
মায়া বুঝলো জুথি অভিমান করেছে। তাই সে মুখে একটু হাসি নিয়ে বললো ‘না রে আমার সোনা বোন। রাগ করিস না। শোনা কী লিখেছিস। আজ পর্যন্ত তোর কবিতা আমার আগে কেউ পড়েছে বা শুনেছে বল তো? আমিই তো আগে শুনবো। শোনা।’
জুথি মুখ ছোট করে বললো‘যা, তোকে শুনতে হবে না। তুই আমাকে ভালোবাসিস না। তুই আমার থেকেও বেশি তোর রাজপুত্রকে ভালোবাসিস।’
তখন মায়ার বাবা, অর্থাৎ জুথির মেসো, সব শুনতে পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো এবং চিৎকার করে বললো—
‘তোমাদের সব কথা শুনলাম। তোমরা ঘুমাবে কখন? আর জুথি মা, এরকম কেন করছো? একদিন তো তোমাদের দু’জনেরই স্বামী আসবে। তখন তোমরা একে অপরের থেকে বেশি নিজের স্বামীকেই তো ভালোবাসবে। নাকি..!’
মায়া বাবার কথা শুনে লজ্জায় পড়ে গেলো। এতক্ষণ ধরে সে তার স্বপ্নের রাজপুত্রের কথা বলছিল, আর তার বাবা শুনে ফেলেছে। মনে মনে বললো— “ছি! এটা সে কী করলো!”
তারপর শব্দ করে বলে উঠলো ‘বাবা, তুমি ঘুমাও তো। এখন থেকেই স্বামীর কথা বলছো! না, আমি শুধু আমার বোনকেই ভালোবাসি, আর কাউকে নয়।’
হাসতে হাসতে মায়ার বাবা আবার ঘরের দিকে পা বাড়ালো এবং বললো‘তোমরা যা ভালো বোঝো। কোনোদিন তো আর বড় হলে না, ছোট হয়েই রয়ে গেলে তোমরা। হা... হা...!’
দু’জনে দরজার দিক থেকে চোখ সরিয়ে একে অপরের দিকে তাকালো। জুথি মায়াকে জড়িয়ে ধরলো এবং বললো ‘আমার সোনা দিদি!’
‘থাক, আর এত আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না। এবার শোনা তোর কবিতা।’
জুথি মুচকি হেসে নোটবইটা মোমবাতির আলোয় নিয়ে গেলো এবং পড়তে শুরু করলো.....
"সূর্য ডোবে চাঁদটি হাসে, জাগতে থাকি রাতে,
জাগতে জাগতে মনের ভিতর, তোমারই সাথে—..... "
↓
পূর্বগগনে বাদল গুলোকে ভেদ করে কমলা বর্ণের আগুনের গোলার মতো সূর্য উঠছে। বসন্ত কালের কোমল বাতাসে কৃষ্ণুচুরার পাতা গুলোকে স্পর্শ করে দোলাচ্ছে যেভাবে মিষ্টি বাচ্চা কে তার মা দোলনায় দোলায়। লাল রঙের কৃষ্ণুচুরার পাপড়ি খসে খসে পড়ছে মাটিতে এবং সবুজ ঘাসের গালিচায় আংশিকভাবে ঢেকে দিচ্ছে। এই কোমল বাতাসের মধ্যে কোথা থেকে একটা শব্দ ভেসে আসছে....
"কল্পনারই কল্পলোকে পরিকল্পনা করই,
কিভাবে সেই নীল ঠিকানায় যেতে পারি, তুমি-আমি?"
জুথি কবিতা আবৃত্তির অনুশীলন করছে। বাড়ির আঙিনায় কৃষ্ণচূড়ার তলায়। সাদা রঙের ওড়না দিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে রেখেছে, তার সাথে সাদা কালো রঙের সালোয়ার কামিজ পরিধান করে রয়েছে সে। মেহেন্দি দেওয়া হাতে নোট বই ধরা। গাছটার এদিক ওদিক হাঁটছে এবং অনুশীলন করছে কবিতার। দু একটা কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি তার নোট বইয়ের ওপর ঘুড়তে ঘুড়তে পড়ছে এবং তার নোট বইয়ের পাতা গুলো বাতাসের সংস্পর্শে নড়ে নড়ে উঠছে।
এত সুন্দর মন্ত্র মুগ্ধকর পরিবেশের মধ্যে ভেসে এলো একটা কর্কশ—ঝাঁঝালো কন্ঠস্বর—
‘এই ভাবে কবিতা লিখে আর পরে জীবনে কিছু হবেনা, তার থেকে ভালো ঘটক অনেক ভালো ভালো সম্বন্ধ আনছে বিয়ে করে ফেল।’
জুথি পিছনে ঘুরে হেঁসেল ঘরের দিকে তাকালো। তার মাসী সাবিনা কথাটা বললো। কথাটা জুথি গায়ে মাখলো না এবং নিজের মতো অনুশীলন করতে লাগল। আবার সাবিনা বল উঠলো ‘দিদি তো নিজে গেছে গেছে আরেক জালা কে দিয়ে গেছে। বলি জুথি, তোর কি কানে কথা লাগেনা? কি বললাম এক্ষুনি। আয় হেঁসেলে আয় আর আমার সাথে হাতে কাজ করে কাজ গুলো শিখে রাখ। নাহলে স্বামীর ঘরে গেলে শাশুড়ি আবার বলবে 'মা ছিলোনা বলে মাসীটাও কাজ কাম শেখায়নি' তখন আবার আমারই নিন্দা হবে।’
জুথি থমকে দাড়ালো। সাবিনার কথা তার মনে একবারে তীরের মতো আঘাত করলো। তার কষ্ট হচ্ছে,খুব কষ্ট হচ্ছে, চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। নোট বই অশ্রুজলে ফোঁটা ফোঁটা দাগ সৃষ্টি করলো। তখনই জীবন অর্থাৎ জুথির মেসো বলে উঠলো ‘তোমার না সবকিছুতে সমস্যা। দিলে তো মেয়েটাকে কাঁদিয়ে। সে যা ইচ্ছা তাই করুক তোমার তাতে কী? সে আমার মেয়ে সে আগে তার স্বপ্ন পূরণ করবে তারপর বিয়ের কথা আসবে। আর তার স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করব আমি।’
তখন পিছন থেকে আরেকটা কন্ঠস্বর শোনা গেলো ‘আমি নয় বাবা আমরা। আমার বোনের স্বপ্ন পূরণে আমিও তার পাশে দাড়াবো।’
কথা গুলো শুনে জুথি পিছনে ঘুরে তাকালো। সে আবিষ্কার করলো উঠানে দাড়িয়ে আছে তার মেসো এবং তার মায়া দিদি। আবার সাবিনা বলে উঠলো ‘হ্যাঁ আরও কাঁধে তুলো মেয়েকে। কোথায় বিয়ে দিয়ে বিদায় করবে তা না সারাজীবন তাকে মাথায় তুলে রাখবে।’
মায়া তখন হুংকার দিয়ে বলে উঠলো ‘মা তুমি বার বার বিয়ে বিয়ে করোনাতো। বোনের থেকে আমি বড়ো এখনও পর্যন্ত আমার বিয়ে হয়নি আর শুধু বোনের বিয়ে নিয়ে মাথা ব্যাথা ধরাচ্ছ।’
জীবনআরও যোগ করলো ‘এত দিন শুনেছি মায়ের থেকে মাসীর দরদ বেশী আর এখন যখন মা নেই তখন মেয়ে কে মাসীই অবহেলা করছে। বলি এত অবহেলা করোনা মেয়েটার মধ্যে কিছু একটা তো আছে দেখবে একদিন এই মেয়েই আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে।’
বলে জীবন জুথির দিকে তাকালো। জুথিও মেসোর কথা শুনে চোখ মুছলো এবং একটা মুচকি হাসি দিলো। মায়া উঠান ঠেকে ধপ করে আঙিনায় নেমে পড়লো এবং ছুটে গিয়ে জুথি কে জড়িয়ে ধরলো।
‘কাঁদেনা জুথি ,বোন আমার কাঁদেনা। জানিসই তো মা একটু ওইরকমই। কাউকেই তেমন সহ্য করতে পারেনা। তুই দুঃখ পাস না।’
‘হ্যাঁ মায়া আমি দুঃখ পাচ্ছিনা। আসলে আমার মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। আমি কী কোনদিন ওই রাতের কথা ভুলতে পারবোনা মায়া। বল না ভুলতে পারবোনা। আমার যখনই মনে আসে খুব দুঃখ হয়।’
সাবিনা আবার বললো ‘ হুম দূঃখ তো হবেই। অপয়া সব তোর জন্য হয়েছিল ওইরাতে। তুই অপয়া,তোর উপস্থিতির কারণেই আমার দিদি আর জামাইবাবু মারা গেছে এখন আবার আদিখ্যেতা দেখাচ্ছে। তুইই তোর মা বাবার মৃত্যুর কারণ।’
জীবন বললো ‘তোমার দিদি তোমার থেকে বেশি আপন জুথির। সে তার মা হয়। ওই মায়ের পেটের মধ্যেই জুথি দশ মাস দশ দিন থেকেছে আর তার হাত ধরেই সে পৃথিবীর মুখ দেখেছে। অতএব তোমার থেকে জুথিরই বেশী আপন আর কষ্টতাও তারই বেশী।’
‘চুপ করো তোমার সবাই চুপ করো। আমি আর সহ্য করতে পারছিনা।’
জুথি তার দু হাত কানের কাছে দিয়ে আর্তনাদ শুরু করলো। নোট বই অনেক আগেই হাত থেকে ছুটে মাটিতে পড়েছে এখন জুথিও মাটিতে পা দুমড়ে বসে পড়লো। এবং কানে হাত দিয়ে আর্তনাদ করতে থাকলো।
জীবন দৌড়ে গিয়ে জুথি কে ধরলো এবং সে অনুভব করতে পারলো জুথি কাপছে। মায়া আর জীবন দুজন মিলে ধরে তাকে দাঁড় করালো এবং ঘরের দিকে নিয়ে গেলো। সাবিনা ছুটেযাচ্ছিল ঘরের দিকে তার আগে ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিলো জীবন। মায়া জুথির মাথার কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
বাইরে থেকে সাবিনা দরজা ধাক্কা দেয়। জীবন গম্ভীর স্বরে বলে ‘তুমি হেঁসেলে যাও। তোমাকে আসতে হবেনা এখানে তোমার উলট পালট কথার জন্যই এই অবস্থা হলো জুথির।’
‘আমি আবার কী করলাম রে বাবা। যা সত্য তাইই তো বললাম।’
‘তুমি চুপ করো। তোমরা মেয়েদের এই এক দোশ বুঝলা। নিজের দোশ স্বীকার করতে চাওনা। তুমি চলে যা
ও, এখানে ঢোকার কোনো প্রয়োজন নেই তোমার। চলে যাও তুমি চলে যাও.....’
চলবে......