Ziaur Rahaman Shilon

Ziaur Rahaman Shilon

 

Ziaur Rahaman Shilon

অণুগল্প:

হিসেবের খাতার বাইরে।

ভোরের আলো ঠিকমতো ঢোকার আগেই অনিরুদ্ধ উঠে পড়ে। আজও বেরোতে হবে। কোথায়—সে নিজেও ঠিক জানে না। মাধবী জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে, হাতে চায়ের কাপ। কথাবার্তা কমে গেছে অনেকদিন। তবু দু’জনেই বোঝে, এই নীরবতাই এখন তাদের সংসারের ভাষা।
টেবিলজুড়ে ছড়ানো কাগজপত্র—রেশন কার্ড, আধার, পুরোনো কাজের অভিজ্ঞতার কাগজ, স্কুলের ফি রসিদ, হাসপাতালের বিল। সরকারী দপ্তরে ঘোরাঘুরির চিহ্ন যেন প্রতিটি ভাঁজে। অনিরুদ্ধ কাগজগুলো গুছিয়ে নেয়, আবারও। কাগজ থাকলেই কি কাজ জোটে?

মাধবী হিসেবের খাতা খুলে বসে। চাল, ডাল, ওষুধ—সবকিছুর দাম বেড়েছে। ছেলের স্কুল থেকে নোটিস এসেছে, পরের মাসে ফি না দিলে নাম কাটা যাবে। মেয়েটার কাশিটা আবার বেড়েছে, ডাক্তার বদলাতে হবে কি না ভাবছে। ওষুধের নাম মুখস্থ, কিন্তু দামগুলো কেমন যেন প্রতিদিন বদলে যায়।

দুপুরে ফোন আসে। “আজও কিছু হলো না”—অনিরুদ্ধের গলায় ক্লান্তি। মাধবী শুধু বলে, “ঠিক আছে।” আসলে ঠিক কিছুই নেই, তবু এই কথাটুকুই ভরসা।
বিকেলে বিদ্যুতের বিল আসে। খাতায় নতুন অঙ্ক যোগ হয়। কোথা থেকে আসবে, কে জানে।
রাতে ছেলেমেয়েরা পড়তে বসে। ছেলে জিজ্ঞেস করে, “বাবা, তুমি কী কাজ করো?” অনিরুদ্ধ হাসে, উত্তর দেয় না। মাধবী বুঝতে পারে, এই হাসির ভেতরে জমে আছে অপমান আর অপেক্ষা।
ঘুমোবার আগে মাধবী হিসেবের খাতা বন্ধ করে। অনেক হিসেব আজও মেলেনি। আলো নিভে যায়। অন্ধকারে অনিরুদ্ধ বলে, “কাল আবার যাব।”

মাধবী শোনে। জানে—এই ‘কাল’ই তাদের শেষ ভরসা। কিন্তু কালটা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটাই অজানা থেকে যায়।

~জিয়াউর রহমান শিলন

ZIAUR RAHAMAN SHILAN


অষ্টম গর্ভজাত।

কারাগারে ঘোরে ঘোর অমানিশা, দিকে দিকে হাহাকার,
কংসের ত্রাসে ম্রিয়মাণ ধরা, রুদ্ধ মুক্তিদ্বার।
শৃঙ্খলে বাঁধা দেবকী-বাসুদেব, নয়ন যে অশ্রুপথ,
এলো সে লগন— পূর্ণ যে হবে দৈববাণীর রথ।
অষ্টম গর্ভ ধন্য করিয়া নামিলে মর্ত্যলোকে,
অন্ধকার চিরে আলোর জোয়ার ঝরিল সবার চোখে।
হাতে নেই অস্ত্র, ঠোঁটে মৃদু হাসি, নীল তনু অনুপম,
তুমিই দাতা, তুমিই বিধাতা, অশুভের যম।
ভাদ্রের রাতে উত্তাল যমুনা পথ ছেড়ে দিল ভয়ে,
গোকুলে চলিলে নন্দের ঘরে নবরূপ সাথে লয়ে।
যশোদার স্নেহে, মাখনের লোভে জুড়ালো ভক্ত প্রাণ,
অধর্ম বিনাশে কৃপাসিন্ধু করিলে অভয় দান।
কুরুক্ষেত্রে সারথি হয়ে দেখালে সত্যের জয়,
তব চরণে শরণ নিলে ঘুচে যায় সব ভয়।
যুগে যুগে তুমি আসিবে ফিরিয়া মুছাতে ধরার পাপ,
ভক্তিভরে ডাকিলে তোমায় জুড়ায় মনের তাপ।
তুমিই কৃষ্ণ, তুমিই বিষ্ণু, জগতের আধার,
অষ্টম গর্ভজাত হয়ে ঘুচালে আঁধার।
বাঁশির সুরেতে প্রেম বিলালে, গীতায় দিলে জ্ঞান,
তোমার চরণে হে দয়াময়, জানাই কোটি প্রণাম।


Ziaur Rahaman Shilon


কবিতা: ক্ষুধার মিছিল…

শহরের বুকে ব্যস্ত চাকা, ধুলো ওড়ে নাকে মুখে,
ছোট্ট শিশুটি হাত পেতে রয়, হাড় জিরজিরে বুকে।
আঁচল ধরেছে মায়ের অসহায়, পেটের টানে যে চলা,
রেলস্টেশনে কান পাতলেই— না-বলা দুঃখের কথা।
বাসস্ট্যান্ডের কোলাহল মাঝে, চোখের ভাষা যে একা,
আঙুল উঠিয়ে মুখের কিনারে, ভাতের স্বপ্ন আঁকা।
মা দাঁড়িয়েছে ছায়ার মতন, বিবর্ণ তার বেশ,
মিনিট তিনেকের সিগন্যাল টুকু, জীবন এখানেই শেষ।
ট্রেনের কামরায়, ট্রাফিক মোড়ে, অবুঝ হাতের ইশারা,
একটু দয়া কি একমুঠো চাল, জীবনটা পথহারা।
ওদের নেইকো খেলনা-বায়না, নেইকো কোনোই ঘর,
শহরটা শুধু পিচ-ঢালা পথ, মানুষগুলো সব পর।
কবে মিটবে এ আগুনের জ্বালা, কবে থামবে এ হাহাকার?
শিশুদের হাতে বইয়ের বদলে— কেন এই অবিচার?
একটু খানি করুণা নয়, চাই বেঁচে থাকার অধিকার,
বেলার শেষেও জোটে না যেন— শূন্য থালার অন্ধকার।


Ziaur Rahaman Shilon



নীরব লাল বাক্স ।

পোস্ট অফিসের পাশে দাঁড়িয়ে নীরব লাল স্মৃতিবাক্স,
রঙ ফিকে হলেও ভরে আছে তার চিঠির ছোট্ট ছোট্ট গল্প।
এক সময় মানুষ আসত, থামত এখানে এসে,
মনের কথা কাগজে লিখে রেখে যেত ভেসে।
মায়ের লেখা সন্তানের নামে আদরের ভাষা,
বাবার চিঠিতে থাকত ভরসা, থাকত আশা।
প্রেমের কথাও লুকিয়ে থাকত কাগজের ভাঁজে,
লাজুক শব্দে ভালোবাসা জমত এই বাক্সের মাঝে।
রানার এসে খুলে নিত চিঠির ভরা মুখ,
খবর নিয়ে ছুটে যেত, ভাঙত অনেক দুঃখ।
চিঠির সাথে যেত হাসি, যেত চোখের জল,
ডাকবাক্স ছিল মানুষের আপন সম্বল।
আজ আর কেউ তাকায় না তার দিকে ফিরে,
ডিজিটাল দুনিয়ায় সবাই ব্যস্ত অন্য নীড়ে।
মোবাইলের পর্দায় বন্দি সম্পর্কের গান,
হারিয়ে গেছে কাগজের সেই আপন টান।
মানুষ বদলেছে, বদলেছে সময়ের পথ,
স্মৃতিগুলো আজ দাঁড়িয়ে আছে নীরব রথ।
মানুষের মতো লাল বাক্সটিও দাঁড়িয়ে একা,
কাজ হারানো বুকে নিয়ে—নীরবতার দেখা।


~ জিয়াউর


Ziaur Rahaman Shilon

কবিতা: ঘাসফুলের কথা (অস্তিত্বের মর্যাদা)।

আমি এক অতি সামান্য ঘাসফুল, পথের ধুলোয় মিশি,
আমাকে মাড়িয়ে চলে যায় কত, মানুষ রাত ও নিশি।
তবুও আমি ফোটা বন্ধ করি না, আপন খুশি মনে,
আমারও আছে বাঁচার অধিকার, এই বিশ্বভুবনে।
বড় যারা তারা ছোটদের কেন, তুচ্ছ জ্ঞান করে ভাবে?
সবারই তরে স্রষ্টার ভালোবাসা, সমানভাবে যে রবে।
মানুষের মর্যাদা পোশাকে নয়, ফুটে ওঠে তার আচরণে,
ছোট ছোট অবদানেই জগত হাসে, রেখো তা স্মরণে।
ক্ষুদ্র বলে কি নেই কোনো দাম? ঘাসেও শিশির নাচে,
সৌন্দর্য কেবল গোলাপের নয়, ঘাসফুলেরও আছে।
সমাজের সেই নিচু তলার মানুষ, যাদের ভাবো তুচ্ছ,
তাদের শ্রমেই সভ্য গড়েছে, তোমার ওই উচ্চ।
সম্মান দিতে শেখো গো সবারে, ছোট-বড় ভেদাভেদ ভুলি,
মানুষ হিসেবেই দেখুক মানুষ, এই কামনা জানাই তুলি।
ঘাসফুল হয়েও হাসতে জানি আমি, স্রষ্টায় রেখে মন,
অল্পতে তুষ্ট থাকতে পারাই, জীবনের শ্রেষ্ঠ ধন।
হিংসে করো না বড়দের দেখে, ছোটদের করো না ঘৃণা,
সবার সুরেই বাজছে প্রকৃতি, এই জীবনের বীণা।
অস্তিত্ব যার ক্ষুদ্র হলেও, উদ্দেশ্য তাহার মহৎ,
সবার তরে জায়গা রেখো ভাই, বড় করো এ জগৎ।

~ জিয়াউর রহমান শিলন।

articleandstory



রম্য কবিতা: দুঃখের সঙ্গে হাসির চা..

দুঃখ এসে বসে আজ চেয়ারের কোণে,
চিনি ছাড়া চা খায়, তবু মুখে মোনে।
স্মৃতি বলে—“আয় রে, পুরোনো বন্ধু,”
হাসি লুকিয়ে থাকে বালিশের তলায় বন্দী।
কালকের কান্না আজ হাঁচিতে ভাঙে,
ভেজা চোখে রোদ্দুর গুনগুনে রাগে।
হারানো কথারা জোকস হয়ে ফেরে,
ভুল বোঝাবুঝি আজ গল্পের নেশায় ঢেরে।
দুঃখ বলে—“আমিও তো ক্লান্ত মানুষ,”
হাসি জবাব দেয়—“চল, হই একটু চুপচাপ সুখ।”
স্মৃতির আলমারিতে তালা ভাঙা শব্দ,
কিছুটা ব্যথা, কিছুটা মিষ্টি নিরর্থক।
শেষে দেখি—দুঃখই সবচেয়ে আপন,
হাসতে হাসতে সে-ই শেখায় বাঁচার গুণ।


articleandstory.com


কবিতা: সবুজ মায়ার তরী

কবি: জিয়াউর রহমান শিলন।

কচুরিপানার সবুজ চাদর, ঢেকেছে নদীর জল,
তারই মাঝে পথ খুঁজে নেয় ছোট এক ডিঙি তল।
মাঝি হয়ে আমি বৈঠা ধরি, দু’হাতে প্রচণ্ড টান,
তুমি পাশে বসে শুনছো প্রিয়, আমার হিয়ার গান।
বেগুনি ফুলের মেলা চারিধারে, হাসছে তারা সবি,
জলে ফুটে ওঠে আমাদের এই প্রেমের রঙিন ছবি।
বাঁধা বিঘ্ন ঠেলে এগিয়ে চলি, নেই কোনো সংশয়,
তোমার চোখের পলক বলছে—আমার হবেই জয়।
পায়ের কাছে জল থৈথৈ, মনে একরাশ আশা,
এই তো জীবন, এই তো আমাদের আজন্ম ভালোবাসা।
কচুরিপানারা পথ আগলায়, আমরা করি যে জয়,
তোমার ছোঁয়ায় দূর হয়ে যায় যত ছিল দ্বিধা-ভয়।
বনের পাখি গান গেয়ে যায়, আকাশটা আজ নীল,
তোমার মনের গহিন কোণে আমার মনের মিল।
নদী বয়ে যায় নিরবধি, আমরাও চলি ভেসে,
সুখ খুঁজে পাই দুজনা মিলে অচিন কোনো দেশে।
মাঝি হয়ে আমি তোমার তরী আজীবন যাবো বয়ে,
সব বাধা মোরা নেবো যে হাসিমুখে প্রেম দিয়ে সয়ে।

articleandstory.com


কবিতার নাম: অন্তরের শান্তির পথ

আধ্যাত্মিক জীবন মানে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া নয়, বরং নিজের ভেতরে ফিরে আসা।
যেখানে প্রতিদিনের টেনশন শব্দ করে কাঁপায় মন, সেখানে নীরবতা শেখায় স্থির হতে।
বিষণ্ণতা যখন দীর্ঘ ছায়া হয়ে পাশে বসে, তখন বিশ্বাস ধীরে আলো জ্বালে।
উদ্বেগের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া শ্বাস আবার নিজের ছন্দ খুঁজে পায়।
আধ্যাত্মিকতা কোনও জাদু নয়, তবু তা মনকে দেয় গভীর আশ্রয়।
এখানে কষ্ট অস্বীকার হয় না, বরং বোঝা যায় আরও মানবিকভাবে।
নিজেকে দোষারোপ করার অভ্যাস এখানে আলগা হয়ে যায়।
সময়ের চাপ তখন আর বুকের ওপর পাথর হয়ে বসে থাকে না।
প্রার্থনা হোক বা ধ্যান, তা মনে এনে দেয় প্রশস্ত আকাশ।
যেখানে ভাবনাগুলো আর একে অন্যকে ধাক্কা দেয় না।
এই শান্তিতেই লুকিয়ে থাকে মুক্তির প্রথম স্বাদ।
ভেতরের শব্দ কমলে বাইরের পৃথিবীও সহজ লাগে।
আত্মার সঙ্গে সংলাপ শুরু হলে ভয় ধীরে বিদায় নেয়।
মানুষ তখন শেখে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি নয়।
শান্ত থাকা কোনও দুর্বলতা নয়, বরং শক্তির চূড়া।
এই পথেই টেনশন, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ ধীরে মিলিয়ে যায়।


— জিয়াউর রহমান শিলন





কবিতার নাম: অস্তিত্বের ব্যবচ্ছেদ।

শহরের কংক্রিটে আজ কেবলই আদিম নখের আঁচড়,
প্রত্যেকে এখানে শিকারি, প্রত্যেকের হাতে লুকানো পাথর।
ভোরবেলা রাজপথে যে মিছিলে মিশে যায় অগুনতি মুখ,
তাদের পকেটে ব্যক্তিগত দীর্ঘশ্বাস আর ধার করা সুখ।
গতির নেশায় ছুটছে সবাই, পিছে ফেলে মানবিকতার ছায়া,
ব্যস্ত এই গাণিতিক শহরে কারো জন্য অবশিষ্ট নেই মায়া।
যোগ্যতমের জয়গান গাইতে গাইতে বিবেক আজ মৃত শ্মশানে,
বেঁচে থাকা মানেই কেবল দহন, রক্তক্ষরণ এই বিষাক্ত গানে।
এখানে স্বপ্ন দেখার আগে লাইসেন্স নিতে হয় ক্ষুধার কাছে,
নরম ঘাসের বদলে মানুষ এখন কেবল ধারালো কাঁটায় বাঁচে।
মুক্তির আকাশ আজ রুদ্ধ হয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থের কারাগারে,
আমরা সবাই বন্দী এক অদৃশ্য ইঁদুর দৌড়ের নীলচে কুয়াশায়।
এ শহরে সবাই কেবল চেনে জটিল প্রতিযোগিতার অঙ্ক আর দেনা,
চেনা মুখগুলো আজ মুখোশের আড়ালে হয়ে গেছে ভীষণ অচেনা।
লড়াই ছাড়া বেঁচে থাকা এখানে পরাজিত এক নির্জন স্তব্ধতা,
অস্তিত্বের শিকড়ে এখন কেবল তীব্র জেদ আর কঠিন নীরবতা।
প্রতিটি চাবুকের দাগ লিখে রাখুক অভিজ্ঞতার এক একটি নির্জন মিনার,
লড়তে লড়তেই চিনে নিতে হবে আত্মমর্যাদার নিজস্ব অধিকার।
পিছু হটে যাওয়া মানেই তো ধূসর বিস্মৃতির অতল যবনিকাপাত,
লড়াইয়ের এই তীব্র দহনেই জন্ম নিক আগামীর সাহসী সুপ্রভাত।


~ জিয়াউর রহমান শিলন



Ziaur Rahaman Shilon


মাঘের পিঠে পুলি। (ছড়া)
____________________________

মাঘের আকাশ, কুয়াশা ঢাকা,
থালায় পিঠের, আলপনা আঁকা।
সকাল বেলা, উনুনে আঁচ,
শুরু হলো, পিঠের নাচ।
পুলি পিঠার, পেটের ভেতর,
পুর ভরা সব, থৈ থৈ থর।
নারকেল আর, নলেন গুড়,
গন্ধে পাগল, অনেক দূর।
খোকন সোনা, থালা হাতে,
বসল খেতে, পিঠের সাথে।
গরম ভাপে, জিভটি পোড়ে,
কান্না থামে, মিষ্টি ঘোরে।
দুধ পুলিতে, চুমুক দেয়,
সাদা তিলক, নাকেতে নেয়।
পায়েস বাটি, সাবাড় করে,
আরাম লাগে, পেটটি ভরে।
মাঘের শেষে, শীতের ছুটি,
পিঠে খেয়ে, লুটোপুটি।
খুশির মেলা, ঘরের কোণে,
সুখ জমেছে, মনে মনে।


articlenadstory.com


দূরত্বের ওপারে তুমি

বিকেলের আকাশে তখন শেষ রোদের সোনালি রেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো অশ্বত্থ গাছের নিচে বসেই প্রথম কথা হয়েছিল অনিরুদ্ধ আর তিথির। তিথি কবিতা লিখত, অনিরুদ্ধ শুনতে ভালোবাসত। কথা বলতে বলতে কখন যে দু’জনের মাঝখানে এক অদৃশ্য সেতু তৈরি হলো, কেউ টের পায়নি।


দিনগুলো ছিল সহজ। ক্লাস শেষে একসঙ্গে হাঁটা, রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা। অনিরুদ্ধ বলত, “একদিন অনেক দূরে যাব, নিজের একটা জায়গা বানাব।” তিথি হেসে বলত, “আমি থাকব তোমার পাশেই।” তখন ‘দূরত্ব’ শব্দটা তাদের অভিধানে ছিল না।

হঠাৎ একদিন বিদেশে গবেষণার সুযোগ এলো অনিরুদ্ধের জীবনে। আনন্দের সঙ্গে লুকোনো ছিল বিচ্ছেদের আশঙ্কা। যাওয়ার আগের সন্ধ্যায় তিথি শুধু বলেছিল, “ভুলে যেও না।” অনিরুদ্ধ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—“দূরত্ব আমাদের হারাতে পারবে না।”


প্রথম দিকে প্রতিদিন কথা হতো। সময়ের ব্যবধানও মানিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে ব্যস্ততা বেড়ে গেল, কল কমে এলো, বার্তাগুলো ছোট হতে লাগল। একদিন তিথি বুঝল, অনিরুদ্ধের কণ্ঠে আর আগের উষ্ণতা নেই। তারপর নেমে এলো এক দীর্ঘ নীরবতা—অজুহাতহীন, ব্যাখ্যাহীন।

বছর কেটে গেল। তিথি তার লেখা প্রথম বইয়ের প্রথম পাতায় লিখল—“দূরত্বের ওপারে তুমি।” সে জানে, অনিরুদ্ধ হয়তো আর কোনোদিন ফিরবে না। তবু ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না; তা রয়ে যায় গভীর কোনো স্থানে, যেখানে সময়েরও পৌঁছনো কঠিন।


রাতের আকাশে তারা দেখলে তিথির মনে হয়, পৃথিবী যত বড়ই হোক, কোথাও না কোথাও অনিরুদ্ধও হয়তো একই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পথ আজ আলাদা, জীবন আলাদা, তবু যে অনুভূতি একদিন নীরবে জন্মেছিল, তা আজও নিভে যায়নি। মিলন না হলেও সেই ভালোবাসাই তাদের গল্পকে অর্থ দিয়েছে।


কারণ কিছু মানুষ জীবনে পাশে থাকে না, কিন্তু হৃদয়ে থেকে যায় চিরকাল—দূরত্বের ওপারে, তবু একেবারে অন্তরের কাছাকাছি।


articleandstory.com


কবিতা: পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।

​হাওয়ায় ওড়ে শিমুল তুলো মাঠের ধারে বন,
ফাগুন দিনের এই আলোতে মুগ্ধ সবার মন।
শীতের চাদর সরিয়ে দিয়ে প্রকৃতি আজ সাজে,
পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।
​নতুন পাতায় রঙের খেলা আমের ডালে বোল,
ফাগুন হাওয়া আলতো করে দিচ্ছে মনে দোল।
সবুজ ঘাসে শিশির হাসে রোদের ঝিলিক মেখে,
পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।
​দখিন হাওয়া বইছে বেগে ফুলের গন্ধ মেখে,
রঙিন ডানা প্রজাপতি আকাশ পথে এঁকে।
রাঙা পথের ধুলোয় ওড়ে উদাস মনে শেষে,
পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।
​শুকনো পাতার তানে তানে উদাস দুপুর কাটে,
সুরের মায়া ছড়িয়েছে ওই গাঁয়ের মেঠো ঘাটে।
উথাল পাথাল খুশির জোয়ার রঙিন বেশে এসে,
পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।
​বনের পথে আবির ওড়ে রঙের হবে খেলা,
আবার বুঝি বসবে মনে নতুন মিলন মেলা।
দুঃখ ভুলে শান্তি সুখে সবাই মাতুক হেসে,
পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।

জিয়াউর রহমান শিলন


www.articleandstory.com

কবিতা: পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।

​হাওয়ায় ওড়ে শিমুল তুলো মাঠের ধারে বন,
ফাগুন দিনের এই আলোতে মুগ্ধ সবার মন।
শীতের চাদর সরিয়ে দিয়ে প্রকৃতি আজ সাজে,
পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।
​নতুন পাতায় রঙের খেলা আমের ডালে বোল,
ফাগুন হাওয়া আলতো করে দিচ্ছে মনে দোল।
সবুজ ঘাসে শিশির হাসে রোদের ঝিলিক মেখে,
পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।
​দখিন হাওয়া বইছে বেগে ফুলের গন্ধ মেখে,
রঙিন ডানা প্রজাপতি আকাশ পথে এঁকে।
রাঙা পথের ধুলোয় ওড়ে উদাস মনে শেষে,
পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।
​শুকনো পাতার তানে তানে উদাস দুপুর কাটে,
সুরের মায়া ছড়িয়েছে ওই গাঁয়ের মেঠো ঘাটে।
উথাল পাথাল খুশির জোয়ার রঙিন বেশে এসে,
পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।
​বনের পথে আবির ওড়ে রঙের হবে খেলা,
আবার বুঝি বসবে মনে নতুন মিলন মেলা।
দুঃখ ভুলে শান্তি সুখে সবাই মাতুক হেসে,
পলাশ ফুল ফুটেছে, বসন্ত এসে গেছে।

জিয়াউর রহমান শিলন


Ziaur Rahaman Shilon



এক দশক তুমি


নব দম্পতির সেই লাজুক সকাল আজও মনে আছে,
তোমার হাত ধরা প্রথম প্রতিশ্রুতির কাছে।
দিন গড়িয়ে বছর হলো, বছর গড়িয়ে দশক,
তবু তোমার চোখে আজও খুঁজি প্রথম আলোক।
ঝড় এলে তুমি ছিলে নীরব শক্তির দেয়াল,
সুখ এলে তুমি হলে আমার হাসির রঙিন জোয়ার।
অভাবের দিনেও তুমি স্বপ্ন জ্বেলে রাখো,
ক্লান্ত সন্ধ্যায় তুমি শান্তির আলো ঢালো।
তোমার নীরবতায় পাই গভীর কথার মানে,
তোমার হাসিতে আজও জীবন নতুন গানে।
পথ ছিল কঠিন, তবু হাত ছাড়োনি কোনোদিন,
ভালোবাসা শিখিয়েছো নিঃশব্দ প্রতিদিন।
সংসারের ছোট্ট ঘর তুমি স্বর্গ করেছো,
আমার ভাঙা স্বপ্ন আবার জোড়া লাগিয়েছো।
আজ এক দশক পরে আবার বলি নতুন করে,
তুমি আছো বলেই জীবন এত সুন্দর ভরে।
এই ভালোবাসা শুধু আমার নয়, সকলের গান,
প্রতিটি স্বামীর হৃদয়ে থাকুক এই সম্মান।
চিরদিন থাকো তুমি আমার হৃদয়ের পাশে,
ভালোবাসা বেঁচে থাকুক তোমার আমার নিশ্বাসে।


www.articleandstory.com



বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি


​দুয়ারে দাঁড়িয়ে ছোট্ট শিশুটি গুনছে প্রহর রোজ,
বাবা কি ফিরবে? আনবে কি আজ তার জীবনের খোঁজ?
বৃদ্ধা মা-বাবা ঝাপসা চোখেতে পথের পানে চায়,
ছেলের ফেরার প্রতীক্ষা শুধু বিষণ্ন সন্ধ্যায়।
​প্রিয়তমা তার হাসিমুখে হাতে এঁকেছিল আল্পনা,
দেশসেবায় সঁপে দিয়ে তারে করেছিল কল্পনা।
সংসারসুখ তুচ্ছ করিয়া পাড়ি দিলে দূর পথ,
বুকের ভেতরে জ্বলছিল শুধু দেশরক্ষার শপথ।
​হঠাৎ করেই আকাশটা কেন মেঘেতে হলো কালো?
মুহূর্তে বুঝি নিভে গেল সব গৃহের প্রদীপ আলো।
বাবার হাতের সেই উপহার পৌঁছাল না আর ঘরে,
কান্নাভেজা এক নীরব শহর গুমরে গুমরে মরে।
​শ্রীনগরগামী সেই রণপথে নামে বিভীষিকা ঘোর,
পুলওয়ামার তপ্ত ধুলোয় ছিঁড়ল প্রাণের ডোর।
আজকের এই দিনে ঝরল রক্ত, স্তব্ধ হলো প্রাণ,
মাটির মমতায় মিশে গেল সব ত্যাগের অমর গান।
​রক্তে ভেজা ধুলোমাখা সেই কঠিন ধমনী-পথ,
সাক্ষী রইল বীরত্বের আর অটুট সে শপথ।
স্বজন হারার আর্তনাদ আজো হিমালয় ছুঁয়ে যায়,
তোমাদের এই ঋণ মেটানোর ভাষা কি আছে ধরায়?
​স্মৃতির পাতায় অম্লান রবে তোমাদের এই দান,
হৃদয়পটে খোদাই রবে ত্যাগের অমল নাম।
নত শির রবে মোর শুধু ঈশ্বরেরই দ্বারে,
শ্রদ্ধাঞ্জলি সঁপিলাম আজ বীর শহীদের তরে।


www.articleandstory.com


মন চঞ্চল


মন আজ অকারণ উড়ে যায় দূর আকাশেতে,
নীলিমার খোঁজে ভেসে যায় অদেখা প্রহরেতে।
মেঘের ভাঁজে লুকায় স্বপ্নের রঙিন ইশারা,
অন্তর জুড়ে জাগে নীরব আলোর ধারা।
অজানা পথের শেষে ডাকে মৃদু সম্ভাবনা,
অশ্রুত সুরে বাজে হৃদয়ের গোপন বাসনা।
দূর দিগন্তে মেলে রৌদ্রের সোনালি হাত,
ছায়ার ভেতর ফুটে ওঠে আশার প্রথম প্রভাত।
চোখের পাপড়িতে জাগে নীরব রৌদ্রের আবেশ,
ভাবনার ডানায় ভেসে ওঠে অচেনা স্বপ্নের দেশ।
কথার আড়ালে লুকায় অনন্ত অনুভব,
নিশীথ রাতে জাগে মৃদু তারার উৎসব।
হাওয়ার ছোঁয়ায় দোলে অস্থির প্রাণের সুর,
সময়ের স্রোতে বয়ে যায় স্মৃতির মধুর নূর।
অন্তর জুড়ে জাগে নতুন দিনের ডাক,
অন্ধকার পেরিয়ে ওঠে আলোর নীরব হাঁক।
স্বপ্নেরা হাতে হাত রেখে আঁকে রঙিন পথ,
মনের আকাশ জুড়ে ছড়ায় অনন্ত রথ।
চঞ্চলতা শেষে খুঁজে পায় স্থিরতা,
মন তবু ডাকে—চলো, ছুঁই নীল অসীমতা।



~ জিয়াউর রহমান শিলন।





অণুগল্প: কাঁচের দেয়াল।


শহরের ব্যস্ত ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে বসে ছিল নুরসা। তার সামনে রাখা কফি থেকে ধোঁয়া উড়ছে, কিন্তু চোখ দুটো জানলার বাইরের বৃষ্টিতে স্থির। ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে ক্যাফেতে ঢুকল ঈশা। ভিজে একসা হয়েও ঈশার চোখেমুখে এক অদ্ভুত জেদ।
“ও আসবে না, নুরসা। মিছেই অপেক্ষা করছিস,” ঈশা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল।
নুরসা ম্লান হাসল। “ও আসবে। ইয়া কথা দিলে রাখে।”
ঠিক তখনি ক্যাফের কাঁচের দরজায় দেখা গেল ইয়া-কে। তবে সে একা নয়, হাতে একটা বড় ক্যানভাস। বৃষ্টির হাত থেকে সেটাকে বাঁচাতে গিয়ে সে নিজে পুরো ভিজে গেছে। ইয়া ভেতরে এসে নুরসার উল্টো দিকের চেয়ারে বসল। তার আর নুরসার মাঝখানে টেবিলে রাখা ধোঁয়া ওঠা কফি আর ঈশার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
ঈশা গলার স্বর নামিয়ে বলল, “ইয়া, তুই জানিস এই পাগলামির কোনো মানে নেই। কাল তোকে দেশ ছাড়তে হবে। আর নুরসা এখানে একা…”
ইয়া কথা কেড়ে নিয়ে বলল, “সম্পর্কটা তো দূরত্বের নয় ঈশা, অনুভূতির। আমি হয়তো থাকব না, কিন্তু আমার এই ক্যানভাসে নুরসার হাসিটা থেকে যাবে।”
সে ক্যানভাসের মোড়ক খুলল। দেখা গেল বৃষ্টির দিনে ঠিক এই ক্যাফেতেই বসা এক বিষণ্ণ অথচ শান্ত নুরসার প্রতিকৃতি। নুরসা নিজের অজান্তেই ক্যানভাসে হাত রাখল। ঈশা বুঝতে পারল, যুক্তির চেয়েও বড় কিছু এই দুজনের মাঝে আছে, যা সে কোনোদিন বুঝতে পারেনি।
বাইরে বৃষ্টি থামেনি, কিন্তু ক্যাফের ভেতরে তিন বন্ধুর নিরবতা এক গভীর গল্পের জন্ম দিচ্ছিল। যে গল্পের শেষটা বিচ্ছেদে নয়, বরং চিরস্থায়ী এক স্মৃতির ফ্রেমে বাঁধা।

Post a Comment

© Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain