Rayhana yeasmin

Rayhana yeasmin

 

Rayhana yeasmin
“অকূতভয়”

অন্ধকারটা লম্বা ভীষণ,
আলোটা খুব খাটো,
তবু ও জানি, আলোরই লেজ ধরে
ছুটে চলে কালো।
ভরসা থাকুক আলো জুড়ে,
কালোর দিকে ভয়টা ছুড়ে।
শক্ত খুঁটি পার হয়ে যায়
ঝড়ঝাপটা শেষে।
তেমনি করেই অকূতভয়
লড়ে আনে আত্মবিজয়।


Rayhana yeasmin


“সে “তোমার চুলে জলের ঘ্রান

গালে তোমার টোল।
স্বপ্ন ভরা দৃষ্টি তোমার
দৃপ্ত ঠোঁট নিটোল।
সত্য বচন কন্ঠে তোমার
বক্ষভরা আশার গান।
নতজানু বিনয় তোমার
সাহস ভরা প্রান।
পেশীবহুল হাত দুটোতে
অঞ্জলী ভরা দান।

Rayhana yeasmin


“দূরত্ব”

পার্থিব অপার্থিব থেকে দূরে,
এক ছায়াপথে আটকে আছি,
আমি আর আমার চাওয়া।
ছুটে চলেছি আলোকবর্ষ
তবু থেকে যায় নাগালের বাইরে
আমি আর আমার চাওয়া।

Rayhana yeasmin

“লিপস্টিক”


সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি, দোকানি কিছুতেই উত্তর দিচ্ছেন না। পড়ে আছেন অন্য দুজন মহিলাকে নিয়ে। পাঁচ-ছয় বার হয়ে গেছে। ভাবলাম, আরেকটু অপেক্ষা করি।
দেখলাম, কী করে গলে গলে বলছে—
“আরে ম্যাডাম, আপনি যেটাই পরবেন অপূর্ব লাগবে আপনাকে। নিন না, যেটা খুশি নিন। আপনার সঙ্গে দাম নিয়ে কোনো দ্বিমত হবে না, ম্যাডাম। কোনটা কোনটা দেবো?”
“না, দেখে আসি আরেকটু,” বলেই সঙ্গিনীকে নিয়ে চলে গেলেন।
আমি ও বাঁচলাম। বললাম—
“এখন পর্যন্ত আপনি ওড়নাটার দাম বলেননি, এখন বলেন।”
“ও, আন্টি, এটা? তিনশ পঞ্চাশ টাকা।”
আমাকে আন্টি বলল, আর ওনাদের ম্যাডাম! ওসব পাত্তা না দিয়ে বললাম—
“আচ্ছা, দুশো দিই?”
“না, আন্টি, তিনশ দেন।”
টাকা বের করতে করতে কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করলাম—
“আচ্ছা, তোমার ওই ম্যাডামকে খুব তো সময় দিলে। তা উনি এত সময় নিয়ে দেখেও তো নিলেন না।”
দোকানি আমাকে আন্টি বলল, আর বয়সে সে আমার চেয়ে দশ-বারো বছর ছোটই হবে। তাছাড়া প্রথম দেখায় সবাইকে আমি ‘আপনি’ই বলি।
তো ছেলেটি উত্তরে যা বলল—
“আন্টি, খেয়াল করছেন? উনি টকটকে লাল লিপস্টিক দিয়ে মার্কেটে আসছেন। কী মেকআপ করছেন! এরা অনেক টাকা নিয়া আসে। নিলে একসাথে আট-দশটা নেয়। এরা দরকারে কিনে না, শখে কিনে। ওনারা মুডে চলে। একটু তোয়াজ করলে আমার মাসের বেচা হইয়া যায় একসাথে। আর আপনি আসছেন দরকারে। আপনি দাঁড়িয়ে থাকবেন, কিন্তু উনি বা ওনার মতো সবাই দাঁড়ান না। পটাইয়া ধইরা রাখতে হয়।”
আমি হা হয়ে শুনছিলাম।
“তা তুমি এত বুঝ?”
“হ্যাঁ, আন্টি। অভিজ্ঞতা, অভিজ্ঞতা।”
“ও, তা কত বছর ধরে কাপড় বিক্রি কর?”
“এই চার-পাঁচ বছর ধইরা।”
ও শুদ্ধ আর আঞ্চলিক মিশিয়ে কথা বলতে শুরু করল।
“আর টকটকে লাল লিপস্টিক দেওয়া ম্যাডামরাই আমার লক্ষ্মী কাস্টমার। আপনার মতো মেকআপ ছাড়া যারা, ওনারা খুব হলে দুইটা—এর বেশি না। আর দরকার বলেই আসছেন, তাই অপেক্ষা করবেন।”
“ও…” বলে আমার কেনা ওড়নার প্যাকেট নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ির পথ ধরি।

articleandstory.com



রম্য গল্প “অপভ্রংশ ” –রায়হানা ইয়াছমিন

আরে আরে বলইদ্যা কয় কী? আমাদের গাঁয়ে বোকা কথা বললে “বলদ” বলে—তাই বলে। এটা তবু বোঝা যায়। কিন্তু আমার চাচাতো বোনের নাম “হতি” শুনে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না ওর আসল নাম কী।
ফাতেমা → হতে মা → হতি।
বেচারি খুব বিরক্ত হয় নামটা শুনে।
আমার বড় বোন চুপচাপ টাইপের মানুষ। ওর ডাক নাম “শিল্পী”। পশ্চিম ঘরের জেঠি কিনা ডাকে “ছেবলি”! আমাদের গাঁয়ে এমনও হয়—আপনি শুনলে বুঝবেনই না নামটার আসলটা কী ছিল।
এমন একটা নাম—“বুইল্লা”!
ভুলে যাওয়া থেকে ভুলা, তা থেকে বুলা, তারপর বুইল্লা!
ওরকম নাম আবার হয় নাকি?
আমি সেদিন পুকুরে যাচ্ছিলাম। এক জেঠি ডাকলেন,
—এই ফাকি, হুনতো!
আমার নাম পাখি। আর ওভাবে ডাকলে আমি শুনবও না।
আমার কাছে, বা আমাদের সব ভাই-বোনের কাছে, এসব হয়তো এত আজব লাগত না যদি ছোটবেলায় গাঁয়েই থাকতাম। বাবা সরকারি চাকুরে ছিলেন। অবসরের পর গাঁয়ে এসেছি। এসে থেকেই নামের ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগে।
“শুক্কুইরা”—এই নামটার মানে কী, তাও বুঝতে পারি না। ওর নাম নিশ্চয়ই শুক্র না!
সেদিন গোল্লাছুট খেলতে নতুন একটা ছেলে এসেছে। ভাইয়া নাম জানতে চাইলে সে বলল,
—আমার নাম আনারস।
মাঠে হাসির হুল্লোড় পড়ে গেল। পরে জানা গেল—আনোয়ার হোসেন।
রইস্যা আছে একজনের নাম—রইস থেকে রইস্যা হবে হয়তো।
জসিম হয়ে যায় জইস্যা।
খাদিজা → খতেজা → খতু।
আমরা ভাই-বোনরা রীতিমতো খেলি এই নামগুলো নিয়ে—গানের অন্তরীক্ষের মতো এলোমেলো। বাসার হতি’র ভাইয়ের নাম, তাকে ডাকে বাইস্যা।
আমরা একটা সূত্রও বের করেছি—সব ‘স’ গুলো একসময় ‘হ’ হয়ে যায়। মাঝখানে কিছু কিছু আবার হারিয়েও যায়।
কিন্তু এত খোঁজাখুঁজির পরও আমরা আরেকটা নামের কোনো সুরাহা করতে পারিনি—
“আবুইল্লা”।”বুইল্লা”নাম টার মতো এটাও বুঝতে পারছি না কি ছিল!




নাম ছাড়া “বুয়া”

সকালে কলিং বেলের শব্দে আমি দরজা খুললাম,দেখি বুয়া । আজকে তিন দিন পর দেখা, আমি কিছু বললাম না। সে বিস্তৃত হাসি দিয়ে বলল,
—“বাবি, বালা আছুইন?”
আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম। যখনই কাজে ফাঁকি দেয় তখন ই এই হাঁসিখানা দেখা যায়।সে হড়হড় করে বলল, গ্রামে গিয়েছিলো জরুরি কাজে, তাই তিন দিন আসতে পারে নি। আমার অফিস যাওয়ার তাড়া ছিল,তাই কিছু বললাম না।তার চোখে খুশির ঝলক, অথচ স্বাভাবিক ভাবেই রান্না ঘরের দিকে চলল। যেতে যেতে বলল –
“আইজ ছা খাইয়াম আগে। আফনে খাইবান?”
আমি শুধু হালকাভাবে বললাম, “আচ্ছা, বসিয়ে দেন।”

সে দ্রুত রান্নাঘরে চলে গেল, হাতের কাজগুলো করছে—আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে আছি, মনে হচ্ছে, এই ছোটখাট রুটিনেই তার পুরো দিন।অথচ তাকে ছাড়া এই তিন দিন আমার অবস্থা শেষ।কথা না বাড়িয়ে চলে এলাম অন্য রুমে।তার জীবন কখনো সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই কাজ করতে করতে শিখেছে, ভয়ে নয়, কিন্তু টিকে থাকার প্রয়োজনে।সে প্রথমে বলে নিয়েছে তাকে বকাবকি করা যাবে না।তিন দিন গ্রামের কাজে থাকলেও, মুখে স্বাভাবিক হাসি; অথচ ভেতরে সে জানে—এই হাসি তার নিজের জন্য, আমি ও বলেছিলাম না এলে আগে থেকেই জানাতে।কি সে বেলা! নিজের বেলায় ষোল আনা।

একমাত্র এই ছোট কাজগুলোই তাকে ধরে রাখে। থালা বাসন ধোয়া, বাসন সাজানো, গজগজ—সবকিছুর মধ্য দিয়ে সে নিজেকে বোঝায়: “আমি টিকে আছি। কেউ আমার জীবন বা আমার অনুভূতিকে ভেঙে দিতে পারবে না।”সে প্রধানত তিনটি কাজ করে, কাপড় ধোয়া,ঘর মোছা আর থালাবাটি ধোয়া। মুড ভালো থাকলে তবকারি কেটে দেয়, কখনো আমার শ্বাশুড়ির চুলে তেল লাগিয়ে দেয়। কিন্তু কাজ বেশি হলে থালাবাটি ঝনঝন শব্দে ধোবে আর একা একা গজগজ করতে থাকবে। সেদিন চা খেতে খেতে গল্প করছিল – বাবি, আমার ফুলায় আমারে জিগায় – মা তুমারে বেকতে বুরা কয় কিল্লিগা, তুমি তো জুয়ান। আমি কইছি-বুরা না, “বুয়া” কয়।

কামের মাইনষেরে বেকতে বুয়া কয়। _”কেন্ ? তোমার কি নাম নাই।”ওর ছেলের সহজ প্রশ্ন টা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। আমি বললাম আচ্ছা আমি আপনাকে কি বলে ডাকবো? জবাবে হেঁসে বলল -বাবি, শফিকের মা ডাইক্কেন।ওর চোখের ঝিলিক টা আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গেলো না। ঈদের আগে একদিন আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল ওর হাজব্যান্ড সব টাকা হাতিয়ে নিয়ে যায়। তিন বাসায় কাজ করে, ওর হাসবেন্ড রিকশা চালায় কিন্তু সংসারে অশান্তি আর টানাটানি লেগেই থাকে। বললাম – তোমার ছোট ছোট তিন বাচ্চা, অন্য কি এমন খরচ? মুখটা শক্ত হয়ে গেল নিমিষেই -“ব্যাডাইনে জুয়া খেললে সংসারো আয় থায়ে? আমার ডিও তাইনের লাগে।পোলানডি না থাকলে একমি যাইতাম মনলয়।শুদু এদ্দুর?

 আমি কিছু কইলে আমার গাও আত তুলে হে।”থাক কিছু বলতে যাইয়েন না। যখন শান্ত থাকে তখন না হয় বুঝিয়ে বলবেন, এটুকু বলে সেদিন স্বান্তনা দেই। আমার কাছে তার রোজগারের সঞ্চয় চব্বিশ হাজার টাকা রেখে যায়। আবার সপ্তাহ খানেক খবর নেই রফিকের মায়ের। আমি কতবার বলেছি যদি দরকার পরে আগে থেকে জানাবেন, আমরা আশা করে থাকবো না। না, সে না জানিয়েই লা পাত্তা থাকবে। সপ্তাহখানেক পর এসে চুপচাপ রান্না ঘরে ঢুকে শব্দ ছাড়া কাজ করছে।কথা না, হাঁসি না, আবার থালাবাটি বেশি দেখে গজগজ ও করছে না।

আমি নরম স্বরে জানতে চাই – কি? এবার কোথায় গেলেন? ফোন নম্বর টা ও বন্ধ?কলের জলের সাথে চোখের জল মিশে যাচ্ছিল। কিন্তু চোখ তুলে বলল – “আর এমত অইবো না। আমি আর কামাই দিতাম না। রফিকের বাফে আরেক খান বিয়া কইরা আমগোরে ছাইরা গেছে।”আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না।ওর চোখ বলছিল ও ধাক্কাটা সামলে নিতে পারবে। “দরকার অইলে আরো দুইডা বাসা লইয়াম।”চোখে জল আর মুখে হাসি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বলল।






“ত্রিভুবন ”

যখন সমস্ত বোধ যায় হারায়ে মাথা ছেড়ে,
তখনো শূন্যতা থাকে নীরবে ঘিরে ধরে।
সেই শূন্যতার মাঝে ও তিনি নিরন্তর,
সমস্ত ইন্দ্রিয় ছাপিয়ে, চেতনার অন্তর।
জাগতিক সকল পাওয়া ফুরোবার পর,
তবু ও কিছু আরাধ্য থাকে অন্তরে —
তা-ও তাঁকেই ঘিরে ফেরে বারেবার,
মা—তিনি আমার সকল ঘিরে।



Post a Comment

© Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain