JOYDEV GANGAPADHYA

JOYDEV GANGAPADHYA

JOYDEV GANGAPADHYA


 একটি প্রতিশ্রুতির গল্প

ডাঃ অঞ্জন গ্রামের একজন সচ্চরিত্র, মেধাবী চিকিৎসক। সারাদিন রোগী দেখার পর রাতের দিকে তিনি চেম্বার বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই দরজায় আস্তে টোকা পড়ল।
দরজা খুলতেই দেখলেন—এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। বয়স খুব বেশি নয়, হয়তো সবে কুড়ির ঘরে পা দিয়েছে। মুখে উদ্বেগ, কপালে ঘাম।

— “ডাক্তারবাবু, মা খুব অসুস্থ। দয়া করে একবার আমাদের বাড়িতে যাবেন?”

অঞ্জন এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন মেয়েটার দিকে। কেমন যেনো চেনা মনে হলো মুখটা। যেনো কোথাও আগে দেখেছেন। তবুও স্মৃতি ধরা দেয় না। তিনি ব্যাগ নিয়ে মেয়েটার সঙ্গে রওনা হলেন।

রাতের অন্ধকার পথ পেরিয়ে মেয়েটার বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অঞ্জনের মনে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি হলো।

মেয়েটি দরজা খুলে ভিতরে নিয়ে গেল। বিছানায় শুয়ে থাকা রোগিণীকে দেখে অঞ্জনের বুকটা ধক করে উঠল। আলোটা একটু বাড়িয়ে তিনি আরেকবার তাকালেন—হ্যাঁ, ভুল করার সুযোগ নেই।

এই তো… এ তো তার লাবন্য।

তরুণ বয়সের প্রেম। সেই লাবন্য, যার হাত ধরে ঘরের আঙিনা থেকে নদীর ধারের পথ অবধি হাজার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
যে রাতদিন তার চোখে শুধু অঞ্জনকেই দেখত।
এক ভুল বোঝাবুঝি, এক মুহূর্তের অভিমানে তারা দুই জগতে হারিয়ে গিয়েছিল।

আজ এত বছর পর, তিনি তারই বিছানার পাশে ডাক্তার হয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু এই লাবন্য আর আগের মতো প্রাণবন্ত নয়। মুখে গভীর ক্লান্তি, শ্বাস চলছে কষ্টে।

অঞ্জন চিকিৎসা শুরু করলেন। কিন্তু যতই তিনি চেষ্টা করলেন, বুঝতে পারলেন—সময় অনেক দেরি হয়ে গেছে। লাবন্য চোখ খুলতেই অঞ্জনের দিকে তাকিয়ে একবার হাসল। সেই আগের মতোই কোমল হাসি, কিন্তু এখন নিস্তেজ।

— “অঞ্জন… তুমি?”
স্বরটা ভাঙা।

অঞ্জনের চোখ ভিজে উঠল, তবু নিজেকে সামলে নিলেন।
— “হ্যাঁ লাবন্য… আমি আছি। তুমি চিন্তা কোরো না।”

মেয়েটি অবাক হয়ে দু’জনকে দেখছিল।
— “আপনারা… একে অপরকে চিনেন?”

লাবন্য খুব ধীরে মেয়ের হাত ধরল।
— “ও মা, এ হলো তোমার… তোমার বাবার জায়গায় থাকা মানুষটা। যাকে আমি একসময় ভালোবেসেছিলাম… কিন্তু কখনো বলতে পারিনি।”

মেয়েটির চোখ বিস্ময়ে ভরে উঠল।
অঞ্জন কথা বলতে চাইলেও শব্দ বের হলো না।

রাত গভীর হলো। লাবন্যের শ্বাস ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে লাগল।
শেষ মুহূর্তে লাবন্য অঞ্জনের হাত ধরল।
— “মেয়েটা…. এর আর কেউ নেই অঞ্জন… ওকে দেখে রেখো।”

অঞ্জন মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
চোখের জলে ঝাপসা হয়ে এলো সবকিছু।

আর কিছুক্ষণের মধ্যেই লাবন্য চিরবিদায় নিল।

ঘর নিস্তব্ধ। মেয়েটি মায়ের নিথর দেহ জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
অঞ্জন এগিয়ে এসে মেয়েটির মাথায় হাত রাখলেন—
ঠিক যেনো একজন বাবা।
একটা দায়িত্ব, একটা সম্পর্ক, আর একটা অপূর্ণ প্রেমের শেষ আলো তার কাঁধে নেমে এলো।

লাবন্য নেই, কিন্তু লাবন্যের রক্ত, লাবন্যের ছায়া—এই মেয়েটি এখন অঞ্জনের জীবনে নতুন অর্থ নিয়ে এল।

সেই দিনের পর থেকে অঞ্জন মেয়েটির পাশে একজন পিতৃতুল্য মানুষ হয়ে আছেন।
মেয়েটিও অঞ্জনকে দেখে তার ভরসা খুঁজে পায়, যেনো জীবনের অন্ধকারে সে আর একা নয়।

লাবন্য হারিয়ে গেলেও, তার রেখে যাওয়া সেই মেয়েটিকে বুকে আগলে নিয়ে অঞ্জন বুঝল—কিছু সম্পর্ক রক্তে লেখা না হলেও, নিয়তি নিজেই সেগুলোকে পূর্ণ করে দেয়।

Post a Comment

© Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain