Ebenezer Elliott (1781–1849)

Ebenezer Elliott (1781–1849)

 

Ebenezer Elliott (1781–1849)

Ebenezer Elliott (1781–1849)

ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মাসব্রো এলাকায় ১৭৮১ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন এবেনিজার এলিয়ট। তাঁর পিতা ছিলেন একজন কট্টর ক্যালভিনিস্ট এবং উগ্রপন্থী মেটাল ব্যবসায়ী, যাঁর তীব্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শ এলিয়টের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বাল্যকালে তিনি মারাত্মক গুটিবসন্তে আক্রান্ত হন, যা তাঁকে শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল এবং মানসিকভাবে কিছুটা একাকী করে তোলে। 

বিদ্যালয়ের প্রথাগত পড়াশোনায় তিনি খুব একটা ভালো করতে পারেননি এবং শিক্ষকদের কাছে অবাধ্য ও অলস ছাত্র হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তবে প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং গাছপালা চেনার অদম্য কৌতূহল তাঁকে নিজের মতো করে শিক্ষিত হতে সাহায্য করেছিল। মাত্র সতেরো বছর বয়সে তিনি তাঁর প্রথম কবিতা রচনা করেন এবং সেই সময় থেকেই সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর সংবেদনশীলতা বাড়তে থাকে। নিজের চারপাশের অভাব এবং বৈষম্য দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা শ্রমজীবী মানুষের প্রতি কতটা নির্দয়। 

প্রকৃতির সান্নিধ্য থেকে পাওয়া সেই সংবেদনশীলতা নিয়ে এলিয়ট যখন তাঁর পিতার লোহার কারখানায় কাজ শুরু করেন, তখন তিনি কঠোর পরিশ্রমের বাস্তব রূপটি খুব কাছ থেকে দেখেন। প্রায় সাত বছর তিনি কোনো বেতন ছাড়াই সেখানে কাজ করেন, যা তাঁর মনে শ্রমিকদের বঞ্চনার ইতিহাসকে স্থায়ীভাবে গেঁথে দেয়। পরবর্তীতে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং স্ত্রীর যৌতুকের অর্থ নিজের ব্যবসার উন্নতির জন্য বিনিয়োগ করেন।

 কিন্তু ১৮১৬ সালের দিকে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তাঁর সেই লৌহ ব্যবসা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হন। জীবনের এই চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং দারিদ্র্যের মুখোমুখি হওয়া তাঁকে পুরোপুরি বদলে দেয়। তিনি নিজের এবং তাঁর পিতামাতার এই চরম দুর্গতির পেছনে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের শস্য আইন বা কর্ন ল'-কে দায়ী করতে শুরু করেন। 

এই ব্যক্তিগত আক্রোশ ও ক্ষোভ পরবর্তীতে সামষ্টিক প্রতিবাদের রূপ নেয় এবং তাঁর লেখনীকে সাধারণ মানুষের হাতিয়ারে পরিণত করে। ব্যবসা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার পর এলিয়ট বুঝতে পারেন যে শস্য আইনের কারণেই দেশে রুটি ও খাদ্যশস্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এই আইন মূলত ভূস্বামীদের অতিরিক্ত মুনাফা পাইয়ে দিতে এবং সস্তা আমদানিকৃত শস্য আটকাতে তৈরি করা হয়েছিল, যার ফলে শ্রমিকরা অনাহারে দিন কাটাচ্ছিল। 

১৮১৯ সালে আত্মীয়দের কাছ থেকে কিছু অর্থ ধার করে শেফিল্ডে তিনি নতুন করে ব্যবসা শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে সফল হন। তবে সফল ব্যবসায়ী হওয়ার পরও তিনি নিজের অতীতের দারিদ্র্যের কথা ভুলে যাননি এবং শস্য আইনের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি এই আইনকে সরাসরি রুটি কর বা ব্রেড ট্যাক্স বলে অভিহিত করেন, যা গরিবের মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছিল। 

তাঁর এই তীব্র অর্থনৈতিক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের তাগিদ থেকেই ১৮৩১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ কর্ন ল' রাইমস। এই কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমেই তিনি সমগ্র ব্রিটেনে কর্ন ল' রাইমার বা শস্য আইনের চারণকবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কর্ন ল' রাইমস প্রকাশের পর এলিয়টের কবিতা ব্রিটিশ সাহিত্যের প্রচলিত রোমান্টিক ধারার বাইরে গিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রার জন্ম দেয়।

 যেখানে সমসাময়িক কবিরা কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, সেখানে এলিয়ট তাঁর কবিতায় তুলে ধরেন শহরের নোংরা বস্তি, শ্রমিকের কঙ্কালসার দেহ এবং ক্ষুধার আর্তনাদ। তাঁর কবিতার ভাষা ছিল অত্যন্ত সহজ, সরাসরি এবং তীব্র আক্রমণাত্মক, যা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মনে আগুন জ্বালিয়ে দিত। 

তিনি তাঁর কবিতায় জমিদার ও পুঁজিপতিদের ভণ্ডামি এবং অনৈতিক বিলাসের তীব্র সমালোচনা করেন। এলিয়টের এই কবিতাগুলো কেবল ঘরে বসে পড়ার মতো সাহিত্য ছিল না, বরং এগুলো রাজনৈতিক সভায় চিৎকার করে আবৃত্তি করা হতো। শস্য আইনের কুফল বোঝাতে তিনি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও কঠোর চিত্রকল্প ব্যবহার করতেন, যা সাধারণ মানুষকে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিত। এই তীব্র প্রতিবাদের ভাষা তাঁকে চার্টিস্ট আন্দোলনের মতো বৃহৎ রাজনৈতিক সংগ্রামের একজন অন্যতম প্রধান অগ্রদূতে পরিণত করে।

 চার্টিস্ট আন্দোলনের শুরুর দিকে এলিয়ট অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং শেফিল্ডে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জনসভায় সভাপতিত্ব করেন। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে তিনি ছিলেন সোচ্চার, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া শ্রমিকদের মুক্তি অসম্ভব। তাঁর লেখা দ্য রান্টার এবং দ্য ভিলেজ প্যাট্রিয়ার্ক-এর মতো দীর্ঘ কবিতাগুলো শ্রমিক শ্রেণীর আত্মমর্যাদা ও অধিকারের কথা বারবার মনে করিয়ে দিত।

 কিন্তু চার্টিস্ট আন্দোলনের একাংশ যখন নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য শারীরিক হিংসা ও সহিংসতার পথ বেছে নেয়, তখন এলিয়ট ক্ষুব্ধ হয়ে সেই আন্দোলন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। তিনি মূলত মুক্ত বাণিজ্য ও শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে ছিলেন, কোনো ধরনের সশস্ত্র বিপ্লবের সমর্থক ছিলেন না। আন্দোলন থেকে সরে গেলেও শ্রমিকদের দুর্দশা লাঘবের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং সাহিত্যচর্চা কখনো থেমে থাকেনি। তিনি শস্য আইন বাতিলের মূল লক্ষ্যেই নিজের সমস্ত শক্তি পুনরায় নিয়োজিত করেন। রাজনীতি ও ব্যবসার এই টানাপোড়েনের মাঝেও এলিয়ট তাঁর লেখনীতে ধর্ম ও ঈশ্বরের ধারণাকে এক নতুন রূপ দিয়েছিলেন।

 তিনি বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর শোষকদের পাশে নেই, বরং তিনি আছেন নিপীড়িত ও ক্ষুধার্ত মানুষের সঙ্গে। তাঁর বিখ্যাত কবিতা দ্য পিপলস অ্যান্থেম বা জনগণের স্তোত্র ছিল মূলত শোষিত মানুষের পক্ষে ঈশ্বরের কাছে এক তীব্র এবং আবেগঘন প্রার্থনা। এই কবিতায় তিনি রাজরাজড়াদের পরিবর্তে সাধারণ দরিদ্র মানুষের মুক্তির জন্য ঈশ্বরের করুণা ভিক্ষা করেছিলেন। তাঁর এই কবিতা এতটাই বৈপ্লবিক ও সংস্কারপন্থী ছিল যে তৎকালীন বহু চার্চে এটি গাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

 তবে সাধারণ মানুষের মাঝে এর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী এবং এটি শ্রমিকদের ধর্মীয় ও নৈতিক বল জোগাত। এই কবিতার সুর এবং বাণী পরবর্তী শতাব্দীতেও মানুষের মুক্তির গানে রূপান্তরিত হয়, যা প্রমাণ করে তাঁর সৃষ্টি কতটা কালজায়ী ছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এবং ১৮৩৭ সালে ব্যবসায় আবারও কিছু আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পর এলিয়ট ধীরে ধীরে সক্রিয় জীবন থেকে অবসরের কথা ভাবতে শুরু করেন। অবশেষে ১৮৪১ সালে তিনি শেফিল্ডের ব্যস্ত শিল্পনগরী ছেড়ে বার্নসলির কাছাকাছি গ্রেট হটন নামের একটি শান্ত গ্রামীণ এলাকায় স্থায়ীভাবে চলে যান। 

গ্রামীণ জীবনে ফিরে গিয়ে তিনি আবার তাঁর ছোটবেলার প্রিয় প্রকৃতি ও বোটানির চর্চায় মন দেন। এই সময়ে তাঁর কবিতায় গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের দুঃখ-দুর্দশার চিত্রও ফুটে উঠতে থাকে। তিনি লক্ষ্য করেন যে শহরের কারখানার মতো গ্রামের কুঁড়েঘরগুলোতেও আরাম ও স্বস্তির বদলে কেবলই রয়েছে অনাহার এবং কঠোর পরিশ্রমের হাহাকার। 

ব্রিটিশ রুরাল কটেজেস-এর মতো কবিতায় তিনি দেখান যে প্রকৃতির সৌন্দর্য কীভাবে দরিদ্র মানুষের জীবনের নির্মম বাস্তবতাকে ঢেকে রাখতে ব্যর্থ হয়。 এই গ্রামীণ একাকীত্ব এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য তাঁর কবিতার সুরকে আরও গভীর এবং কিছুটা বিষাদময় করে তুলেছিল। গ্রেট হটননের এই শান্ত জীবনে থাকার সময়ই ১৮৪৬ সালে এলিয়ট তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্যের খবর পান, যা ছিল ঘৃণিত শস্য আইনের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দীর্ঘ আন্দোলনের পর অবশেষে এই আইন বাতিল করা হয়, যা ছিল এলিয়টের মতো বহু সমাজসংস্কারকের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের জয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনা দেখার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল এবং তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্টির সাথে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করেন। মৃত্যুর মাত্র কিছুকাল আগে তিনি তাঁর কন্যা ফ্রান্সেসের বিবাহ সম্পন্ন করেন তাঁরই এক জীবনীকার জন ওয়াটকিন্সের সাথে।

 দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৮৪৯ সালের ১ ডিসেম্বর মহান এই কবি ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ডারফিল্ডের অল সেইন্টস চার্চের প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করা হয়, যা আজও তাঁর বিপ্লবী স্মৃতির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মৃত্যুর পর ১৮৫০ সালে এলিয়টের অপ্রকাশিত গদ্য ও পদ্যের দুটি খণ্ড মোর প্রোজ অ্যান্ড ভার্স শিরোনামে প্রকাশিত হয়, যা তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভাকে পুনর্মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে। তিনি নিজেকে সর্বদা দরিদ্রের কবি হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন এবং ইতিহাসও তাঁকে সেই আসনেই বসিয়েছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত লেখকদের ভণ্ডামিপূর্ণ সহানুভূতির বাইরে গিয়ে এলিয়টই প্রথম ভিক্টোরিয়ান যুগে শ্রমিকদের নিজেদের ভাষায় কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

 শেফিল্ডের ওয়েস্টন পার্কে ১৮৫৪ সালে তাঁর একটি ব্রোঞ্জের স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয় এবং তাঁর জন্মস্থান রদারহ্যামেও তাঁকে নানাভাবে সম্মানিত করা হয়। এমনকি আধুনিক যুগে এসেও তাঁর কবিতা বিভিন্ন রক মিউজিক্যাল ও গণআন্দোলনের গানে অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর সততা, তীব্র ক্ষোভ এবং শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব তাঁকে বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও স্মরণীয় নাম হিসেবে অমর করে রেখেছে।

Post a Comment

© Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain