অনুগল্প
ভালোবাসা , ০৩/০৭/২০২৫
প্রবীর কুমার চৌধুরী
এ যেন রাজযোটক। মেড ফর ইচ আদার। তাঁদের বিবাহিত জীবন সবার ঈর্ষার কারণ। নিন্দুকেরা বলে হবে নাই বা কেন পণ তো মন্দ নেয়নি। মেয়েটিকে দেখতেও সুন্দরী । শুধু ডান পাটা একটু খাটো। হাঁটার সময়ে একটু ল্যাংচায়। তবে হ্যা দুজন দুজনকে খুব ভালোবাসে যেন চোখে হারায়। রোজ সন্ধ্যায় ছাদে উঠে চাঁদ দেখে। গান গায়।
হঠাৎ একদিন বৌটির শরীর খারাপ হল। প্রথমে গা করেনি । কিন্তু দিনকে দিন খারাপ হতে লাগল। পেটে অসহ্য যন্ত্রনা। পেট চেপে কাঁদতে বসে। শেষে তার স্বামীকে বলতে বাধ্য হল। স্বামী একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হোমিওপ্যাথি ওষুধ এনে দিল। কয়েকদিন খেল কোন কাজ দিল না। একদিন কবিরাজি অষুধ এনে দিল..।এদিকে বৌটির পেটে মারাত্মক যন্ত্রনা, চিৎকার করে। বরটা জড়িয়ে ধরে কাঁদে। একে, তাকে ফোন করে, মতামত চায়। এইভাবেই কেটে যায় বেশ কিছুদিন।
বৌটির ক্রমেই মারাত্মক অবস্থা। হাঁটার মত ক্ষমতা নেই। কষ্টে, কষ্টে রুগ্ন হয়ে গেছে। ঠিকমত খাওয়া দাওয়াও করতে পারেনা। স্বামী বেচারা বাড়ি ফিরে রোজ বৌকে বুকে নিয়ে কাঁদে। গায়ে, পিঠে হাত বোলায়।
একদিন সকালে অফিস যাওয়ার সময়ে ডাক্তার দেখানোর টাকা দিয়ে বৌ সোহাগী বরটা বার বার বলে গেল ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্যে। বেলার দিকে পাশের বাড়ির লোকটাকে নিয়ে ডাক্তারখানার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। হঠাৎ রাস্তার জার্কিঙে বৌটির ভয়ানক যন্ত্রনা শুরু হলো। যেন চোখ দুটো ঠিকরে পড়ছে। দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। বাঁচার আকুলতায় একসময়ে পাশে বসে থাকা লোকটিকে আঁকড়ে ধরলো। তারপরই নিস্তেজ হয়ে পড়ল রিক্সায়।
ডাক্তার খানায় পৌঁছে লোকটি কোন রকমে কম্পাউডারের সাহায্য বৌটিকে তুলে ডাক্তারের সামনে শুইয়ে দিল। ডাক্তারবাবু কিছুক্ষন চেক করে বললেন ” বৌটি মারা গেছেন। তবে সিমটম দেখে মনে হচ্ছে। এপেন্ডিস ছিল বাস্ট করেই মারা গেছেন। তারপর যা হয়। স্বামী এলো, বাপের বাড়ির লোকজন, মধ্যস্ততা, ডেথসার্টিফিকেট। চিতায় তুলে সব নিস্পত্তি।
তিনমাস বাদেই বরের বাড়িতে আবার আলোর রোশনাই। বাড়িটা আত্মীয় স্বজননে ভর্তি। সানাই বাজছে। দুঃখকথারা আকাশে মিলিয়ে গেছে।কন্যাযাত্রীদের হৈচৈ। সুখাদ্যের সুগন্ধে এলাকা ম ম করছে। সবাই একসময়ে একে একে চলেও গেল। বাড়িতে শুধু দোজবরে আর নববধূ। বাসরে মিলিত হওয়ার সময়ে দোজবরে বৌকে জড়িয়ে ধরে বলল ” তোমাকে কথা দিয়ে সেকথা রাখতে কম রিস্ক কিন্তু নিইনি বল “? নববধূ বলল ” কেমন বুদ্ধিটা দিয়েছিলাম তুমিই বল “?
সংরক্ষিত
গড়িয়া, কলকাতা।
আমরা যারা ভিতরে ভিতরে ভেঙে যাই, ০৫/০২/২৬
আমরা যারা ভিতরে ভিতরে ভেঙে যাই,
তারা খুব স্বাভাবিক মানুষ।
রাস্তায় আমাদের দেখে কেউ থামে না,
কারণ আমাদের চোখে কোনো পোস্টার নেই-
শুধু নিয়মিত অভ্যাস করা শান্ত ভাব।
আমরা জানি,
কোথায় কথা থামাতে হয়,
কোথায় মাথা নোয়াতে হয়,
কোথায় হাসিটা ঠিকমতো বসালে
কেউ আর প্রশ্ন করে না।
এই শহর আমাদের শিখিয়েছে
স্বপ্ন উচ্চস্বরে বললে হেসে ওঠে মানুষ,
আর চুপচাপ কষ্ট চেপে মুখ ভর্তি হাসলে
তাকেই বলে পরিণত বুদ্ধিসম্পূর্ণ হওয়া।
আমরা তাই পরিণত হই।
দিনে দিনে,ক্ষনে, ক্ষণে
অল্প অল্প করে নিজেকে শেষ করে। P9
বন্ধুত্ব আজ হিসেবি,খেরোড় খাতায়
ভালোবাসা সময়সাপেক্ষ,
আর বিশ্বাস-
খুব ভারী, বিষাক্ত জিনিস,
সবাই হজম করতে পারে না।
আমরা হজম করি।
কারণ আমাদের পাকস্থলীর অভ্যাস হয়ে গেছে।
অফিসের চেয়ারে বসে
আমরা স্বপ্নগুলোর সিভি বানাই,
জানি-
সবকটা ডাক পাবে না।
তবু পাঠাই।
রাতে বাড়ি ফিরে
নিজের সাথে কথা বলার সময় পাই না,
কারণ ক্লান্ত মানুষকে
নিজেরই বোঝাতে হয়—
সব ঠিকই চলছে।
আয়নাটা তখন সামনে দাঁড়ায়।
সে খুব শান্ত,
খুব নিরপেক্ষ।
সে শুধু দেখায় –
কতটা বদলে গেছি আমরা।
কোথাও গিয়ে
নিজের একটা অংশ হারিয়ে ফেলেছি,
কিন্তু ঠিক মনে নেই –
কবে, কোথায়,কেন।
আমরা কাঁদি না।
কান্না তো এখন বিলাসিতা।
রুদালীরা হাসে –
আমরা শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলি,
আর সেটাকেই বলে দিই-
একটু ক্লান্তি।
তবু আশ্চর্য ব্যাপার কী জানো?
আমরা শেষ হয়ে যাই না।
ভেতরে কোথাও
একটা জেদ রয়ে যায়
এই জীবনটাই শেষ কথা নয়,
এই অন্ধকারটাই চূড়ান্ত নয়।
ভোর আসে।
চা গরম হয়।
কেউ একজন আবার কাজে বেরোয়।
এই সাধারণ দৃশ্যগুলোর ভেতরেই
আমরা আবার দাঁড়াই।
ভাঙা মানুষ হিসেবেই,
কিন্তু পালিয়ে যাওয়া মানুষ নই।
আমরা যারা ভিতরে ভিতরে ভেঙে যাই,
তারাই জানি-
ভাঙার শব্দ কেমন,
আর সেই জন্যই
গড়ার মূল্যটা সবচেয়ে বেশি বুঝি।
অণুগল্প
প্রিয় বান্ধবী, ০৬/০৯/২০২৫
প্রবীর কুমার চৌধুরী
সবাই তখন পই পই করে বারণ করেছিল
বিনয় এমন ভুল করিস না। শেষে এই ভুলের কঠিন সাজা পেতে হবে।
বাণী চলে গেছে আজ দু বছর। বিনয় কম চেষ্টা করিনি বাণীকে ধরে রাখার কিন্তু সবই ভাগ্য। মাত্র দুমাস ডাক্তারবাবু বিভিন্নটেস্ট করে বললেন ” লাস্ট স্টেজ কোন লাভ নেই “। দীর্ঘ পয়ত্রিশ বছরের সম্পর্ক ছেদ করে বাণী পরপারে চলে গেল।
তবুও দুই ছেলেকে বুকে নিয়ে বেঁচে আছে বিনয়। আত্মীয় -স্বজন, বন্ধুরা অনেক বলেছিল…। কিন্তু নিজের রক্ত তো অবিশ্বাস করতে পারেনি। একে একে টাকা – পয়সা, বাণীর গয়না,বাড়ির অধিকার সব সব লিখে দিয়েছিল।
দুইমাসও কাটেনি ছেলেরা প্রোমোটারের হাতে তুলে দিল জমি ও বাড়ি। বিনয় নীরব দর্শক। তারপর প্রোমোটারকে বাড়ি ছেড়ে ভাড়াবাড়িতে যাবার আগে ছেলেরা বলল – বিনয় নাকি ছেলের বৌ’দের সাথে মানিয়ে চলতে পারছে না। সংসারে ভাঙ্গন ধরছে তাই তাকে ওল্ড এজ হোমে থাকতে হবে। পেনশনের টাকাটা শুধু ওদের হাতে তুলে দিতে হবে।
আজ সক্কাল বেলাতেই বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বিনয়ের জিনিসপত্র তোলা হচ্ছে। আজই তাকে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যেতে হবে। বিনয়ের চোখে জল। বুকের মধ্যে বাণীর মালা দেওয়া ছবিটা। আজ ওটাতে যে শুধুমাত্র বিনয়ের অধিকার।
বিনয় দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। শেষবারের জন্যে নিজের হাতে গড়া বাড়িটাকে ভালো করে দেখে নিচ্ছে। এ কদিন দেখে নিয়েছে আলনায় এখনো বাণীর শাড়ি – ব্লাউজ ভাজ করা। বিছানায় তাঁদের দুজনের বালিশ।কাঠের আলমারিতে বাণীর কত স্মৃতিচিহ্ন। এলবামের পাতায় পাতায় হাসিমুখ। এখনও ড্রয়ারে বাণীর সিঁদুর, ক্রিম, চিরুনি দেখে নিচ্ছে। বিনয় সারারাত বুকে নিয়ে শুয়েছিল। বাগানের মাঝের দোনলাটা যেখানে কতদিন চাঁদনীরাতে তারা দুজনে দুলতো আর গান গাইতো। বাণীর হাতে লাগানো মাধবীলতা গাছটা তুলসী না থাকলেও তুলসীমঞ্চটা আজও আছে শুধু বাণী নেই। এবার থেকে বিনয়ও আর এ বাড়িতে থাকবে না। বড় ছেলে সুবিনয় জোরে ধমকে উঠল বাবাকে ” ন্যাকামি হচ্ছে? এতোবছর তো ভোগ -দখল করলে আর কেন এবার মায়া ছাড় “। বলেই বাবার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিতেই বিনয় টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল দোরগড়ায়। ঠিক সেই সময়ে আরেকটি ক্রিম কালারের একটি গাড়ি এসে থামলো। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক সুন্দরী,ব্যক্তিত্বময়ী ষাটোর্ধ ভদ্রমহিলা। এককালে যে প্রচন্ড সুন্দরী ছিলেন দেখলেই বোঝা যায়। সাদা ধবধবে গায়ের রঙ, মাথার চুলও সব সাদা। পরনে দামি গরদের শাড়ি বিত্তের পরিচয় দেয়।
সারা শরীর থেকে অভিযাত্যর বিচ্ছরণ ছড়িয়ে পড়ছে। বিনয়ের হাত ধরে তুলে বললেন – ” ভয় নেই।বলেছিলাম না তোমার অসময়ে আমি ঠিক এসে তোমার পাশে দাঁড়াবো। তুমি ভুললেও আমি তো বন্ধুত্বর ভুলিনি বিনু। ”
বিনয়ের মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আনন্দে। আর্তকণ্ঠে বলে উঠলেন – ” মৃনাল… “।
তার কলেজ জীবনের সবথেকে প্ৰিয় বান্ধবী মৃণালিনী
বন্দ্যোপাধ্যায়, বিখ্যাত ” বন্দ্যোপাধ্যায় জুয়েলারি ম্যানশনের “এর প্রপাইটার…। শীর্ণ, দীর্ণ বিনয় প্রিয়বান্ধবীর হাত ধরে গাড়িতে বসতেই গাড়িটা ছুটতে লাগল নির্ভরতা ও শান্তির উদ্দেশ্যে …।
সংরক্ষিত
গড়িয়া, কলকাতা।
পিসিমা /২১/১১/২০২৪
প্রবীর কুমার চৌধুরী
পিসিমাই আমাদের সংসারে আসল কত্রী। তাঁর শাসনেই বাড়ীর সবাই সন্ত্রস্ত থাকেন। পা ধুয়ে ঘরে ঢুকতে হবে। সন্ধ্যায় খাওয়া চলবে না । বড়দের আলোচনায় ছোটরা থাকতে পারবে না ।
এবংবিধ বহু অনুশাসন মেনেই আমরা বড় হয়েছি ।
একবার আমার বন্ধু আকবর আমার জন্মদিনে বাড়ি এলো । সবাই খাচ্ছে । এমন সময় দেখি আকবর মাথা নিচু করে আছে । আমি বললাম
” কিরে আকবর তুই যে কিছুই খাচ্ছিস না ।শুধু ভাত আর ডাল নিয়ে বসে আছিস ।” আকবর জানালো সে নিরামিষাশী। আমিষ খায়না । আমিষ খাবারে ছোঁয়া খাবারে একটু অস্বস্তি হচ্ছে।
পিসিমা দূরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন খেয়াল করিনি । পিসিমার ভীষণ ধর্মীয় গোঁড়ামি।
জাত – ধর্ম মানেন । হঠাৎ পিসিমা বললেন ” তুমি উঠে এসো । আমি তোমায় নিরামিষ খাবার
দিচ্ছি ” । আমি বুঝতে পারলাম এই বলে আকবরকে পিসিমা তুলে নিয়ে গেলেন । আমার
খারাপ লাগলেও মুখে কিছুই প্রকাশ করলাম না ।
মিনিট পাঁচেক বাদে খাবার জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে দেখি আমাদের পুরান বৈঠকখানা ঘরে পিসিমা কলাপাতায় খেতে দিয়েছেন আকবরকে । ভাত,ডাল,আলুভাজা, আলুপোষ্ট,বেগুনভাজা, দই ও মিষ্টি। আকবর পরম তৃপ্তিতে খাচ্ছে । কিন্তু আমি বুঝেছি পিসিমা আকবর যেহেতু মুসলমান তাই সবার আড়ালে এখানে খেতে দিয়েছেন যাতে ওর ছোঁয়া কোনকিছতেই না লাগে।
রাতে সবাই খাওয়া দাওয়ার পর চলে গেলে পিসিমার বাড়ির সবার সামনেই বললেন ” দেবু তুই দেখছি জাত – ধর্ম সব জলাঞ্জলি দিয়ে দিচ্ছিস । একটা মুসলমানকে কি বলে তুই ঘরে ঢুকিয়ে সব ছোঁয়ালেপা করলি ? তুই কিছু নাই মানিস বা নাই মানতে পারিস কিন্তু আমরা তো মানি । এভাবে সবার জাত ধর্ম নষ্ট করছিস ? ”
সেইরাত্রে পিসিমা রাগে গরগর করতে ,করতে বাড়ি,ঘরদোর , বাসন – পত্র , সব বহুরাত্র পর্যন্ত পরিষ্কার করলেন । আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে
রইলাম অপরাধীর মত।
এর কিছুদিন পর পিসিমা একদিন সিঁড়ি থেকে পা হড়কে পরেই গেলেন । সংজ্ঞাহীন অবস্থা। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হলো। সঙ্গে ,সঙ্গে কাছাকাছি রেমিডি নার্সিংহোমে ভর্তি করা হল। ডাক্টার বললেন
” শরীর থেকে প্রচণ্ড রক্ত ক্ষরণ হয়েছে । এইমুহুর্তে দুবোতল রক্ত দিতে হবে । এদিকে সুগার,প্রেসার হাই।
কিন্তু রক্ত জোগাড় করতে কাল ঘাম ছুটল। কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা এই রেয়ার গ্রুপের রক্ত । এবি নেগেটিভ । ডাক্টার বললেন আপনাদের বন্ধুদের কাছে খোঁজ করুন এই গ্রুপের রক্ত ।
বিরল রক্তের গ্রুপ হল AB নেগেটিভ (AB-)।
তবে AB- কে সাধারণত সর্বনিম্ন সাধারণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় 1% তৈরি করে।
এমন সময়ে খবর পেয়ে কোথাথেকে আকবর দৌড়াতে,দৌড়াতে এসে বলল ” আমি দেব রক্ত ।আমার শরীরে বইছে এবি নেগেটিভ রক্ত । আড়ালে সবাই আলোচনা করছে পিসিমা সুস্থ হয়ে যদি জানতে পারে মুসলমানের রক্ত তাঁর দেহে প্রবেশ করেছে তাহলে রক্ষে নেই । লঙ্কাকান্ড
বাধাবেন । কথাটা কানে যেতেই ডাক্টারবাবু ডেকে বললেন – আপনারা কোন আদিকালে পড়ে আছেন মশাই । মানুষের প্রাণ আগে না জাত ধর্ম ?
যাইহোক শেষ পর্যন্ত আকবর রক্ত দিল সেই রক্ত পেয়ে পিসিমাও ক্রমে সেযাত্রা বেঁচেও উঠলেন ।
পিসিমা আজ দুদিন হল নার্সিংহোমে থেকে বাড়ি এসেছেন। রাত্রে খাওয়ার সময় হঠাৎ পিসিমা আমাকে বললেন ” কাল আকবরকে দুপুরে ডেকে নিয়ে আসবি তো দেবু …” । আমি অজানা ভয়ে কাঁপতে লাগলাম ।
পিসিমার আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা আমার নেই । তাই দুরু ,দুরু বুকে পরদিনই আকবরকে নিয়ে বাড়ি ঢুকলাম । পিসিমা না খেয়ে বসেছিলেন । আমরা বাড়ি ঢুকতেই পিসিমা আকবরকে হাতধরে বললেন – তুই আমার জীবন দান করেছিস বাবা । আমি তোর কাছে চিরঋণী বাবা । তুই আমার কেউ না তবু তুই আমার ছেলের কাজ করলি । আর একটা অনুরোধ রাখিস নারে আমি মরলে আমার মুখে তুই আগুন দিবি। বল না দিবি তো ?”
আবেগে পিসিমার কথা আটকে গেল। তারপর কাঁদতে , কাঁদতে আকবরকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
আমার চোখেও জল। দেখি মা-হারা আকবরের চোখেও শ্রাবণধারা। আমি নীরব ,নিস্পন্দ হয়ে চেয়ে রইলাম হিন্দু – মুসলমান দুই মা – ছেলের স্বর্গীয় এক মিলন দৃশ্যের একমাত্র সাক্ষী হয়ে।
(সমাপ্ত)
#প্রবন্ধ
নারী ও বর্তমান সমাজ, ১৩/০৯/২০২৫
প্রবীর কুমার চৌধুরী
মানব সভ্যতার বিকাশের প্রারম্ভিক মুহূর্তে নারীই ছিল প্রধান। একজন নারীর অনুশাসন মেনেই চলত সেই সময়ের জন বা গোষ্ঠী। নারীই হল সৃষ্টির প্রতীক। নারী থেকেই মানবের সৃষ্টি। দেবীদূর্গা বা মাকালি হচ্ছেন তারই প্রতীক।
কিন্তু কালের বিবর্তনের ফলে সেই শক্তি পুরুষশ্রেণীর হস্তে স্থানান্তরিত হয় অথবা বলা যায় পুরুষ শ্রেণীকতৃক হস্তগত হয় । ক্রমেই নারীজাতি গৃহকোনে নিবাসিত হন।
একটা সময় নারীর কাজই হয়ে যায় সংসার পালন ও বাৎসরিক সন্তান উৎপাদন। ( একটি প্রবাদ বচন-
” সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে ” ) গত শতাব্দীতে বিবাহযোগ্য মেয়ে দেখতে এসে ছেলের বাড়ির গড়গুষ্ঠী
মেয়ের চুল টেনে, মুখ চিমটি কেটে, পায়ের কাপড় উপরে তুলে, সর্ব সমক্ষে হাঁটিয়ে মেয়ের খুঁত দেখতেন । এখানেই শেষ নয় তারপরেও সে রান্না জানে কিনা, সেলাই, ফোঁড়াই। রান্নায় কিসের সঙ্গে কোন ফোড়ন দিলে স্বাদ বেশি হবে এইসব বর্বরচিত জিজ্ঞাসা করা হতো। আজ হয়তো শিক্ষার সংস্পর্শে এসে মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে আর এইসব অসভ্যতা কিছুটা কমেছে।
আজ অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটছে শিক্ষা ও সচেতনতার ফলে। প্রতিবাদও উঠছে নানা প্রান্তরে। কিন্তু এখনও দুস্থ ও নিম্নবিত্তের মধ্যে এই দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা হলেও প্রতীয়মান হয় ।
গত শতাব্দীর প্রথমদশকেও নারী ছিলেন সংসারের বোঝা স্বরূপ। মেয়েসন্তান পরের ঘরে যাবার জন্যে জন্মায়। সুতরাং তার প্রতি একটা ছেলে সন্তানের মতো দায়িত্ব বা সচেতনতা মা – বাবা গ্রহন করতেন না। তাঁকে তখন বেশি লেখা পড়া করানোর কোন তাগিদ মা – বাবারা অনুভব করতেন না, যতটা ঘর সাজানো, রান্নাবান্না ও কাপড় জামা কাচাকাচিতে দক্ষ করতেন। তাকে বিয়ে দিতে গেলে মা -বাবাকে যৌতুক দিতেই সর্বশ্রান্ত হতে হত। আবার বিয়ের পর একজন নারীকে সেই সংসারে দাসীর সমান দায়িত্ব নিতেও হত। এমনও ঘটত যে নারী পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে অক্ষম হলে তিনি নিপীড়িত বা পরিত্যাক্ত হতেন। কিন্তু যে নারী পুত্র সন্তানের জন্ম দিতেন তাঁকে সবাই মাথায় করে রাখতেন।
সেই সময়ে ( আজও অনেক পরিবারে ) ধারণা ছিল পুত্র সন্তান বংশের বাতি জ্বালবে , সংসার দেখবেন, বৃদ্ধ মা -বাবার ভরণপোষণ করবেন। এই ভ্রান্ত ধারণায় ছেলেদের প্রতি বেশি দৃষ্টি দেওয়া হত।
আমাদের সমাজের মোটামুটি তিনটি ভাগ – দুস্থ – নিম্নবিত্ত /মধ্যবিত্ত / উচ্চবিত্ত। উপরিউক্ত কথাগুলো নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্তের ক্ষেতেই বেশি প্রযোজ্য। মধ্যবিত্ত সমাজটা আজও জটিল।
এই বিভাজন অনুযায়ী বলা যায় দুস্থ বা নিম্নবিত্তের ঘরে বা সংসারের বধূরা বেশিরভাগ সংসারের বাইরেও কাজ করেন এবং সেই অর্জিত টাকা সংসারে ব্যাহিত করেন। কিন্তু অনেক ক্ষেতেই দেখা যায় তাসত্ত্বেও তাঁরা স্বামীর দ্বারা অথবা তাঁদের কর্মক্ষেত্রেও নিগৃহীত হয়েছেন বা হচ্ছেন। অবশ্য দিন পাল্টেছে নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়েরা লেখাপড়া শিখছেন। আজকাল তাঁরাও প্রতিবাদ করছেন। পরিচিত বা প্রতিবেশীরাও তাঁদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে মুখবই বিশেষ কার্যকরি ভূমিকা পালন করে।
দুর্ভাগ্য,আজও পথের ধারে কিংবা ডাস্টবিনে নবজাতক কন্যাসন্তান পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে থাকে। মা কতৃক পরিত্যাক্ত হয়ে। এ ক্ষেত্রে বলতেই হয় একজন নারী অপর একজন নারীর শত্রু।
আজও দেখা যায় শিশু পাচার ও বিক্রয় হয়। যেকোন বয়সের মেয়েই চালান হয়। এই একবিংশ শতকেও মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে কত বাবাদের জমি, বাড়ি বিক্রি করে সর্বশ্রান্ত হতে হয়। কিংবা কথামতো যৌতুকের টাকা না পেয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকের দ্বারা চরম লাঞ্ছছিত অথবা মৃত্যু বরণও করে মেয়েরা।
আজও প্রায়ই ঘরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শাশুড়ি – বৌমার মিল নেই। সংসারের অধিকার দখলের চরম দ্বন্দ্ব। প্রায়ই ক্ষেত্রে এডজাস্টমেন্ট কথাটা উঠে আসে কিন্তু ভুলে যাই অ্যাডজাস্টমেন্ট দুতরফেই প্রয়োজন।
যেহেতু বৌ পরের বাড়ির মেয়ে তাই তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা কিন্তু কখনই নয়।
মধ্যবিত্ত সমাজটা ভীষণ জটিল ও কুহেলিকাময়। বাইরে থেকে যা দেখা যায় ভিতরটা সম্পূর্ণ আলাদা।
এ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বামী টিভি দেখেন, বই পড়েন আর অপেক্ষা করেন কখন বৌ কাজ থেকে বাড়ি ফিরে চা করে দেবেন। স্বামী মহারাজ জীবনে কখনও নিজের জামাকাপড় ইস্ত্রি করার সময় তাঁর স্ত্রীর ব্লাউজটা কিংবা সালোয়াড়-কামিজটা ইস্ত্রি করেননা সেটা বোধহয় তাঁর আত্মসম্মানে লাগে। মধ্যেবিত্ত সমাজে এখনও পুরুষরা নারীর উপর হুকুম করতেই বেশি পছন্দ করেন। ব্যতিক্রম তো আছে বা থাকবেই।
দেখা যায় বাড়ির মেয়ে বাইরে ঘুরলে, ছেলেদের সাথে কথা বললে বাবার চোখ লাল হয়। তাঁর চিন্তা হয় ” পাছে লোকে কিছু বলে… “। ” এই পাছে লোকে কিছু বলের ” চিন্তায় মধ্যেবিত্ত সমাজ কাহিল,তটস্থ।
এই সমাজের রক্ষনশীল বাড়িতে বৌকে হতে হবে নম্র, ভদ্র, শান্ত। আর বয়স্ক শ্বশুর শাশুড়ি থাকলে তো সোনায় সোহাগা। বৌয়ের জোড়ে কথা বলা, গান গাওয়া, জোরে হাঁটা, স্বামীর মুখে, মুখে তর্ক করা বারণ। তাহলেই সে অপয়া, অলক্ষনে বৌ হয়ে যাবে।
যে সমাজের কথাটা বলা বাকি – তা হলো উচ্চবিত্ত।
এঁরা ধনী ও ক্ষমতাশালী বলেই প্রতিপন্ন হোন। এবং নারী -পুরুষ উভয় শ্রেণীই যথেষ্ট উপার্জন করেন তাই তাঁরা উভয়ই পর্যাপ্ত স্বাধীনতা ভোগ করেন। গর্হিত অন্যায় না হলে কেউ কারুর কাছে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য থাকেন না। এই সমাজে কিছু, কিছু মানুষ বিয়ে নামক সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে নিজের পছন্দ মতো মানুষের সাথে বসবাস করতে পছন্দ করেন। যেটা
” লিভ টুগেদের ” বলেই পরিগণিত।কেউ, কেউ একাধিক বিয়েতেও পিছুপা নন। এককথায় এই সম্প্রদায় কেউ কারুর উপর নির্ভরশীল নন। কারণ প্রত্যেকেই স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী। এই সমাজের প্রায়ই সবাই শিক্ষিত।
মিলিয়ে দেখলে দেখা যায় উপার্জন কম হলেও দুস্থ ও নিম্নবিত্ত সমাজের সাথে উচ্চবিত্ত সমাজের জীবনধরণের কোথাও, কোথাও বেশ মিল পাওয়া যায়।
মধ্যেবিত্ত সমাজের অন্য দুটি সমাজের কোন মিল না হওয়ার একটি প্রধান কারণ – ওঁরা ” পাছে লোকে কিছু বলে ” র ভয়ে শিটকে থাকেন।
আজকের আধুনিক নারীদের পুরুষের সাথে টক্কর দিয়ে শিক্ষায়, দীক্ষায়,কর্মে ও জীবনধারণে সমান পারদর্শী হওয়ার চেষ্টাকে কুর্নিশ জানাচ্ছি। একজন নারী তাঁর নিজের আলোয় আলোকিত হবেন এটাই আশা করবো। আজ অনেক নারী পুরুষের থেকেও বেশি এগিয়ে যাচ্ছেন এটার জন্যে দেশ গর্বিত । এটাও দেশ এগিয়ে যাওয়ার আরও একটি সোপান।
আজ নারী গাড়ি চালাচ্ছেন, এয়ারে ভাসছেন। বিদেশে গবেষণা করছেন,কলেজের প্রিন্সিপাল হয়ে সফল ছাত্রসমাজ গড়ে তুলছেন এটাই দেশকে প্রভূত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু কষ্ট পাই তখন, যখন নারীরা পুরুষদের অনুকরণ করতে গিয়ে সিগারেট, মদ আরও নানা প্রকার গর্হিত কাজ করেন। দেহ উন্মুক্ত পোশাকের থেকে বোধহয় ঢাকা পোশাকে অনেক বেশি সৌন্দর্য বাড়ায়।
অপেক্ষা করবো মানুষ কবে মেয়েদের ছেলেদের সঙ্গে উপমা দেবেন না। বলবেন না সত্যি মেয়েটা একটা ছেলের সমান কাজ করল । বলবেন না মেয়েটা সংসারের ছেলের অভাব পূর্ণ করেছে। যেদিন নারী নিজ দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে সমাজকে সম্পূর্ণ আলোকিত করবেন একক প্রচেষ্টায়, সেইদিনই সত্যিকারের নারী মুক্তি ঘটবে।
( সমাপ্ত )
#আর_কি_ফিরে_দেখা_হবে_বরাহনগর, ০৬/০২/২৬
প্রবীর কুমার চৌধুরী
কখনও কখনও ভোরের দিকে ঘুম ভাঙলে মনে হয়, আমি যেন আর আজকের এই মানুষটা নই, আমি ফিরে গেছি বরাহনগরের শীলেদের সেই পুকুরপাড়ের সেই ছোট্ট গলির ভেতর, যেখানে আমার ছেলেবেলার দিনগুলো রোদ্দুর হয়ে খেলা করত। চোখ মুছলেই দেখি, পুরনো দুইতলা বাড়ির বারান্দা, নিচের বাগানে নানান গাছের সমাহার। গাছে ঝুলছে কাঁচা হলুদ রঙের বাতাবি, ঝাঁকে ঝাঁকে কাশির লাল শাসওয়ালা পেয়ারা, নারকেল গাছের উপর থেকে গাছিদাদু হাঁক পারছে,
” সরে যাও খোকাবাবু মাথায় গামরা পড়বে… “। আজও যেও নাকে আসে পাকশালের সামনের বড় কাঁঠাল গাছের কচি কাঁঠালের গন্ধ। আজও এই সুদূর গড়িয়ায় বসে বাড়ির সামনের তারকদের পুকুর থেকে উঠে আসা উত্তরের হাওয়াকে মনে হয় দূর থেকে ভেসে আসা কুঠিঘাট থেকে উঠে আসা গঙ্গার হাওয়া।
বরাহনগর তখন আমার কাছে ছিল একটা পৃথিবী,
নিজস্ব, নির্ভেজাল, নিরাপদ। মনে পড়ে মার হাত ধরে বিকেলে পাঠবাড়ির সামনের পথটা ধরে রেবামাসির বাড়িমুখো হাঁটলে মনে হতো ইতিহাসের বুকের ওপর দিয়ে হাঁটছি। সেই জমিদার বাড়ির ইটের দেওয়াল, জজবাড়ির সেই নিরবতা – শীলেদের পুকুরের সানবাঁধানো পুকুরঘাটে যেন কত অজানা কথা জমা করে রেখেছে। আমরা ছোটরা অবশ্য ইতিহাস বুঝতাম না, শুধু দৌড়ে বেড়াতাম, হাসতাম, আর তখন শুধু ভেবেই নিতাম এই পৃথিবীটা চিরকাল এমনই থাকবে। এতো আলো, বাতাস, নীলাকাশ, আর একবুক নিস্বার্থ ভালোবাসায় ভরানো পৃথিবী…।
মনে পড়ে রবিবারের সন্ধ্যায় রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাঙ্গণে দেখানো হত চার্লি চ্যাপ্লিন, লোরেন্স হার্দি, কোনদিন বিপ্লবী ক্ষদিরাম, দেশপ্রেমিক নেতাজি সুভাষচন্দ্র…। দিদার হাত ধরে ঢুকলেই কেমন একটা শান্তি নামত বুকের ভেতর। মিশনে রোজ সন্ধ্যারতিতে ঘণ্টার শব্দ, ধূপের গন্ধ, ভক্তিগানের সুর – এসবের মানে সেই পাঁচবছর বয়সে তখন পুরো বুঝতাম না, কিন্তু আজ বুঝি, সেখানেই প্রথম শিখেছিলাম স্থির হতে, চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতরটা শুনতে। মিশনের সবুজ চত্বর যেন আমাদের ছেলেবেলার নির্ভার হাসিকে আশ্রয় দিয়েছিল।
ঝুলনতলার নামটা শুনলেই আজও মনে পড়ে বিকেলের আলো। মা – দিদা আর মাসি আমরা কয়েকজন মিলে যেতাম সেখানে। প্রতিবছর বসতো ঝুলন। কি বড় বড় সব মাটির পুতুল। কৃষ্ণ, রাধা, আযান ঘোষ, কংস আরও কত পুতুল দিয়ে হত সেই ঝুলন যাত্রা। তাকে কেন্দ্র করেই মেলা। নাগরদোলা, পাঁপড় ভাজা। নারকেলপাতায় লাল – নীল কাগজ সাটা ভেঁপু। সেই ভেঁপু বাজিয়ে বাড়িশুদ্ধ মানুষের পাঁচ বছরের আমি প্রাণ অতিষ্ট করতে সক্ষম হতাম।
সেই ঝুলনতলার ধুলো আজও আমার স্মৃতির গায়ে লেগে আছে।
সরস্বতী পুজোয় কারও হাতে থাকত ঘুড়ি, কারও হাতে মার্বেল। হেরে গেলে রাগ, জিতলে অহংকার—সবকিছুই ছিল ক্ষণস্থায়ী, অথচ গভীর।
রবিবার কুঠিঘাট মানেই গঙ্গার সিঁড়ি। কত বিকেল দিদার বসে থেকেছি সেখানে! ওপারে বেলুড় মঠ, লালবাবার আশ্রম। জলে সূর্যের প্রতিচ্ছবি কাঁপত, আর
আমি ভেবেই নিতাম – ওটাই হয়তো স্বপ্নের দরজা। নৌকা ভেসে যেত, মাঝিরা সুর ভাঁজত। মনে হতো জীবন খুব সহজ, জলের মতোই বয়ে যাবে, কোথাও না কোথাও একদিন গিয়ে মিশবে। তখন জানতাম নাতো , বড় হয়ে জীবন এত হিসেব চাইবে।
দক্ষিনেশ্বরে ছিল আমাদের এক অদ্ভুত টান। মা – বাবার সাথে প্রায়ই ছুটির দিন আলমবাজার দিয়ে ডানলপে পৌঁছাতাম। মন্দিরের চূড়ো দূর থেকে দেখলেই মনে হতো, যেন আকাশ ছুঁতে চেয়েছে। ওঁদের হাত ধরে গিয়েছি কতবার। ভিড়, প্রসাদ, ঘণ্টাধ্বনি
ভক্তিগীতি সব মিলিয়ে এক উৎসব। কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা। হাওয়ায় চুল উড়ত, আর মনে হতো—আমি বড় হয়ে খুব বড় কিছু হবো। সেই স্বপ্নগুলো কবে যে হারিয়ে গেল, টের পাইনি। আমি ছা – পোষা মানুষ ছাড়া কিছুই হতে পারেনি।
আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে বুঝি—সেই দিনগুলোই ছিল আমার সত্যিকারের সম্পদ। বরাহনগরের সে দিনের নরম রাস্তাগুলো, পাঠবাড়ির নীরবতা, মিশনের শান্তি, ঝুলনতলার হাসি, কুঠিঘাটের জলের ঢেউ, আর দক্ষিনেশ্বরের আকাশ,- এসব মিলেই আমার শৈশবের এক নীল মানচিত্র।
আজও মাঝেমধ্যে স্বপ্নে দেখি, আমি আবার ছোট হয়ে গেছি। বন্ধুদের ডাক শুনে ছুটছি। কোথাও কোনো দায় নেই, কোনো ভয় নেই। শুধু রোদ, বাতাস আর সীমাহীন সময়।
হয়তো মানুষ বড় হয়, কিন্তু তার ভেতরের সেই ছোট্ট ছেলেটা কখনও বড় হয় না। সে আজও বরাহনগরের গলিতে ঘুরে বেড়ায়, কুঠিঘাটের সিঁড়িতে বসে থাকে,অবাক চোখে আকাশের তারা গোনার চেষ্টা করে। আর দক্ষিনেশ্বরের আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে।
আর আমি, এই প্রাপ্তবয়স্ক আমি, প্রতিদিন রাতে চোখ বন্ধ করে তাকে একবার ছুঁয়ে দেখি।
কারণ, আমার সমস্ত ক্লান্তির ভেতরেও আমার ছেলেবেলাটা এখনো বেঁচে আছে।
বরাহনগরের মানচিত্রে আজও কি আছে আমার শৈশব। কখনও কখনও মনে হয়, আমার শৈশবটা আসলে একটা পাড়ার নাম। একটা রাস্তার মোড়। একটা দোকানের গন্ধ। একটা বিকেলের আলো।
তাঁতিপাড়া দিয়ে হাঁটলেই কেমন যেন অন্য এক সময়ে ঢুকে পড়ি। কুঠিঘাট রোডের সেই ধুলো, শ্রীমানী পাড়ার সরু গলি, প্রিয়নাথ দে লেনের বিকেলের নরম রোদ—সব যেন আজও আমার পায়ের চেনা পথ। দর্জিপাড়ায় সেলাই মেশিনের টকটক শব্দ কি আজও আছে? ডোম বাগানের গাছপালার গন্ধ, ভোলানাথ স্ট্রিটের চেনা মুখগুলো- সব,সব আগের মতো কি ঠিক আছে? আমার ছোটবেলার পৃথিবীটা খুব বড় ছিল না, কিন্তু ভীষণ গভীর ছিল। ষষ্ঠীতলায় পুজোর সময় আলো জ্বলত, আর মনে হতো দেবতা যেন সত্যিই নেমে এসেছেন। গোপাল লাল ঠাকুর রোড দিয়ে হেঁটে গেলে একটা আলাদা উত্তেজনা হতো। আজও গেলে কি কোথাও কেউ ডাকবে, কেউ কি আগের মতোই হাসবে, কেউ কাছে বসিয়ে গল্প শোনাবে। সিঁথির মোড়, চিড়িয়ামোড় এইসব নামগুলো তো শুধু জায়গা নয়, এরা আমার জীবনের একটা সময়ের চিহ্ন।
শ্রীমানী পাড়ার সেই খেলার মাঠ, আহা! কত দৌড়েছি, কত পড়েছি, কত হেরেছি, কত জিতেছি। তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা ছিল বিকেলের খেলায় কে গোল দেবে। মাঠের ধুলো মেখে, মেখে বাড়ি ফিরলে বড়দের বকুনি আসত, কিন্তু সেই বকুনিও ছিল আদরের মতো।
ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল আমার ছোটবেলার স্কুল। প্রথম হাতেখড়ি, প্রথম বন্ধু, প্রথম শাসন। প্রথম একা রাজপথে চলা, সেদিনের খাতার পাতায় টানা অক্ষরগুলো আজও যেন বুকের ভেতর কাঁপে। স্কুলের ঘণ্টা পড়লেই মনে হতো, জীবন কত সুন্দর, কত সম্ভাবনায় ভরা
কুঠিঘাটের খড়গোলার গায়ের পায়ে হাটা সরু নরম মাটির রাস্তাটা আজও কি আগের মতোই সোদা গন্ধ বহন করছে? সেই সোদা গন্ধ আজও কিন্তু আমার নাকে লেগে আছে আর বাঁশগোলা মাঠের পাশে জয়নিতাইয়ের দোকানের ছয় পয়সার মুড়িমুড়কি! কোথায় গেলে পাবো… কত সুখ ছিল সেই ছোট্ট কাগজের ঠোঙায়। পাঁচটার বিকেলে রোজ ফেরিওয়ালা আসত কাঁধে বোচকা ঝুলিয়ে, দশ পয়সায় চারটে নিমকি বিস্কুট। দিদা প্রত্যেকদিন ছোটমামা আর আমাকে কিনে দিতেন, আমরা যেন রাজা হয়ে যেতাম। আজ লক্ষ টাকার জিনিসেও সেই আনন্দ নেই।
আর মনে পড়ে বিশুদাদুকে কি ভীষণ ভয় পেতাম। অথচ দাদু আমায় কত ভালোবাসতেন। উপহার দিতেন। কিন্তু বাঁধ সাধতো দাদুর বিশাল গোঁফজোড়া। সাথে দৈত্যকার চেহারা, আর্মির পোশাক, ছুটিতে বাড়ি ফেরা মানেই আমার আতঙ্ক। মনে হতো, তিনি যেন গল্পের কোনো বীরপুরুষ—কঠিন, দৃঢ়, অদম্য। অথচ দূর থেকে তাকিয়ে থাকতাম অবাক বিস্ময়ে।
দিদার স্নেহ ছিল আমার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। তাঁর আঁচলের গন্ধ, তাঁর হাতের ভাত, মাছের ঝোল, সবই ছিল মাতৃত্বর অমৃতের ধারার মতো। বড়মামার বুকুনি ভয় মেশানো ভালোবাসা। ছোটমামা ছিল আমার খেলার সাথী, যেন বড়দের ভেতরেও একটা শিশু লুকিয়ে থাকতো । মাসির পুতুলঘরে আমি ছিলাম “পুতুল বর ”। একটা আলাদা সম্মান, আলাদা আদর। সেইসব কণা-কোণে ছড়িয়ে থাকা মুহূর্তগুলো আজও মনের অ্যালবামে ঝকঝক করে।
আজ যখন দাঁড়িয়ে ভাবি, বুঝতে পারি সুখ আসলে খুব ছোট ছোট জিনিসে লুকিয়ে ছিল। ছয় পয়সার মুড়িমুড়কি, দশ পয়সার নিমকি, বিকেলের মাঠ, দিদার কোলে মাথা রাখা – এসবই ছিল আমার স্বর্গ।
কোথায় গেল সে সব দিন? রাস্তা কি বদলে গেছে, না আমি বদলে গেছি? তাঁতিপাড়ার গলি কি আজও আমার নাম ধরে ডাকে? শ্রীমানী পাড়ার মাঠ কি আজও সন্ধ্যায় ধুলো উড়িয়ে দেয়?
সময় আমাদের বড় করে দেয়, কিন্তু বিনিময়ে শৈশবটা কেড়ে নেয়। তবু গভীর রাতে, যখন চারদিক চুপচাপ, আমি স্পষ্ট শুনতে পাই – কুঠিঘাট রোড দিয়ে একটা ছোট ছেলে দৌড়ে যাচ্ছে। তার হাতে মুড়িমুড়কির ঠোঙা, চোখে অগাধ স্বপ্ন।
সে আমিই। সে আজও হারিয়ে যায়নি।
সে রয়ে গেছে বরাহনগরের মানচিত্রে – চিরকাল।
বরাহনগরের মানচিত্রে আমার শৈশব…
কখনও কখনও মনে হয়, আমার শৈশবটা আসলে একটা পাড়ার নাম। একটা রাস্তার মোড়। একটা দোকানের গন্ধ। একটা বিকেলের আলো।
তাঁতিপাড়া দিয়ে হাঁটলেই হয়তো একটা অন্য এক সময়ে ঢুকে পড়বো। কুঠিঘাট রোডের সেই ধুলো, শ্রীমানী পাড়ার সরু গলি, প্রিয়নাথ দে লেনের বিকেলের নরম রোদ – সব যেন আজও আমার পায়ের চেনা পথ। দর্জিপাড়ায় সেলাই মেশিনের টকটক শব্দ, ডোম বাগানের গাছপালার গন্ধ, ভোলানাথ স্ট্রিটের চেনা মুখগুলো – আমার ছোটবেলার পৃথিবীটা খুব বড় ছিল না, কিন্তু ভীষণ গভীর ছিল।
সময় আমাদের বড় করে দেয়, কিন্তু বিনিময়ে শৈশবটা নিয়ে নেয়। তবু গভীর রাতে, যখন চারদিক চুপচাপ, আমি স্পষ্ট শুনতে পাই—কুঠিঘাট রোড দিয়ে একটা ছোট ছেলে দৌড়ে যাচ্ছে। তার হাতে মুড়িমুড়কির ঠোঙা, চোখে অগাধ স্বপ্ন।
সে আমিই। সে আজও হারিয়ে যায়নি। সে রয়ে গেছে বরাহনগরের মানচিত্রে…।
চারটি কবিতা
১)
বসন্তের অন্তরীক্ষে এ জীবন
প্রবীর কুমার চৌধুরী
যখন শুষ্কতার দীর্ঘ উপবাস ভেঙে
ধরণীর কণ্ঠে জেগে ওঠে সবুজ উচ্চারণ,
তখন বুঝি –
মৃত্যুরও একটি সীমারেখা আছে,
তার পরেই বসন্তের বিস্ময়।
পাতাহীন ডালপালায়
হঠাৎ রক্তিম স্পন্দন,
কুঁড়ির ভেতর নীরব বিপ্লব;
মাটির গভীরে জমে থাকা অন্ধকার
ধীরে ধীরে আলোয় স্বাক্ষর করে।
হে জীবন,
তুমি কি তবে এই নবপল্লবের নাম?
অবসন্ন রাত্রির শেষে
অতল সূর্যোদয়ের উচ্ছ্বাস?
দেখো –
আকাশ আজ কোনো শোক জানে না,
বাতাসে বিষাদের কোনো রাজনীতি নেই;
শুধু উড়ছে অদৃশ্য সুরের কণা,
যেন প্রতিটি শ্বাসে পুনর্জন্মের অধিকার।
শিমুলের রক্তিম ঘোষণা
পলাশের দীপ্ত অনল
আমাদের অন্তর-অরণ্যে আগুন জ্বালায় –
সে আগুন দহন নয়,
সে আগুন জেগে ওঠার প্রতিজ্ঞা।
মানুষের ভাঙা স্বপ্নের উপরে
যখন বসন্ত রাখে সবুজ হাত,
তখন ক্ষতও হয়ে ওঠে ফুলের সম্ভাবনা।
ভগ্নতার ভিতরে লুকিয়ে থাকে
অপরাজেয় প্রস্ফুটন।
হে প্রভাতের অমৃত-বাতাস,
আমাদের ক্লান্ত অস্থিতে ঢেলে দাও প্রাণ
আমরা আবার হাঁটতে চাই
অজানা পথের দিকে
যেখানে প্রতিটি ধূলিকণাও বলে ওঠে –
“বেঁচে থাকাই সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব।”
বসন্ত মানে শুধু রঙের উল্লাস নয়,
বসন্ত মানে অন্তরের বিপ্লব
যেখানে মানুষ নিজেকে ফিরে পায়
নতুন বিশ্বাসের আলোয়।
এই জীবন
অপরিসীম আঘাতের মাঝেও
এক অনিবার্য ফুল ফোটার আকাঙ্ক্ষা,
এই বসন্ত –
মৃতপ্রায় সময়ের বুকে
অমরত্বের প্রথম স্বাক্ষর।
চলো তবে,
আমরা প্রত্যেকে একটি করে পাতা হই,
একটি করে কুঁড়ি,
অন্ধকারের বিরুদ্ধে
রঙিন প্রতিবাদের ভাষা।
কারণ বেঁচে থাকা মানে
শুধু শ্বাস নেওয়া নয়,
বেঁচে থাকা মানে
নিজের ভিতরে বসন্ত জন্ম দেওয়া।
২)
অন্তিম অনস্তিত্বের অভিসার, ১১/০২/২০২৬
প্রবীর কুমার চৌধুরী
মৃত্যু এক অবচেতনার অবসানবিন্দু নয়
বরং অনস্তিত্বের অভিসার-দ্বার,
যেখানে সময় নিজেই নির্বাক নির্বাসনে যায়।
দেহ কেবল প্রজ্ঞাহীন পরিধেয়,
আত্মা তার অনামা অভিযাত্রার অভিকর্ষে
শূন্যতার সুদীর্ঘ সোপানে আরোহন করে।
আমরা যাকে বলি অবসান,
তা তো কেবল রূপান্তরের গুপ্ত ব্যাকরণ
অস্তিত্বের অবিনশ্বর ব্যঞ্জনবর্ণ।
কবরের মাটি এক নীরব মহাকাব্য,
যেখানে প্রতিটি অস্থি,লিখে যায় ক্ষণস্থায়ীতার স্বরলিপি।
মৃত্যু –
এক মহাজাগতিক বিরামচিহ্ন,
যার পরে শুরু হয় অমৃতের অদৃশ্য উচ্চারণ।
সংরক্ষিত
গড়িয়া, কলকাতা।
৩)
মুক্ত গদ্য
সত্যি করে বল
প্রবীর কুমার চৌধুরী
বুকে হাত দিয়ে সত্যি করে বলোতো তোমায় আমি ভালোবাসিনি ?
কখনো চলতে চলতে, কখনো জানালার পর্দা সরিয়ে আমায় তুমি দেখোনি?
একটুও কি থমকে যাওনি?
একটুও কি তোমার শ্বাসের ভেতর আমার নামের অক্ষর কেঁপে ওঠেনি?
আমি জানি, এই শহর খুব ব্যস্ত।এখানে সিগন্যালের লাল আলোতেও মানুষ মোবাইল দেখে, এখানে আকাশ ভরা চাঁদ উঠলেও কেউ মাথা তোলে না। তবু আমি বিশ্বাস করতাম,এই কংক্রিটের বুকের ভেতর কোথাও না কোথাও এখনো একটু নরম মাটি আছে।যেখানে ভালোবাসা বীজের মতো পড়ে থাকলেএকদিন অঙ্কুর ফুটবেই।
তোমার চোখে আমি বহুবার নিজের প্রতিচ্ছবি দেখেছি। সেটা হয়তো ছিল ক্ষণিক, হয়তো ছিল ভুল,হয়তো ছিল আমারই হৃদয়ের অলীক, মিছে কল্পনা।
কিন্তু কল্পনাও তো হঠাৎ জন্মায় না, কোথাও না কোথাও তার বীজ থাকে।
তোমার নির্লিপ্ত হাসির কোণায়,
তোমার অন্যমনস্ক চুল সরানোর ভঙ্গিতে,
তোমার হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়ার ভেতর
আমি আমার জন্য একফোঁটা জায়গা খুঁজে পেয়েছিলাম।
আজকাল মানুষ ভালোবাসে না,মানুষ শুধু হিসেব কষে । কে কতটা দেবে, কে কতটা নেবে,কিসে কতটা লাভ, কিসে কতটা ক্ষতি।
ভালোবাসার আগে তারা শর্ত লেখে,
আবেগের আগে লিখে নেয় চুক্তিপত্র।
হৃদয় এখন আর দরজা খুলে দেয় না,
শুধু পাসওয়ার্ড চায়।আর সেই পাসওয়ার্ডও বদলে যায় সুবিধেমতো।
তুমি কি জানো আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম কোনো ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা চাইনি বলে? আমি চাইনি কোনো প্রতিশ্রুতির সোনালি খাঁচায় তোমাকে বন্দি করতে ।আমি শুধু চেয়েছিলাম – একটা পড়ন্ত বেলার বিকেলের মিঠে রোদে আমরা দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকবো,
চুপচাপ,নির্বাক, স্তব্ধ, কোনো শব্দ ছাড়া,
তবু শেষ বিকেলের গোধূলিতে দুটি বুকের ভেতরে ভেতরে হাজার কথার ঢেউ উঠবে। তুমি হয়তো ভাবো- এইসব অতিরিক্ত আবেগের কোনো মূল্য নেই।
এই বর্তমান পৃথিবীটা শক্তদের, হিসেবিদের। যারা চোখের জলকে দুর্বলতা ভাবে, আর হৃদয়কে রাখে তালাবদ্ধ করে।
কিন্তু আমি দেখেছি যারা খুব শক্ত সেজে থাকে তারাই মাঝরাতে নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে।কারণ হৃদয়কে অস্বীকার করলে
হৃদয় একদিন প্রতিবাদ করে।
আমি তোমায় ভালোবেসে ডেকেছিলাম যেভাবে নদী সাগরকে ডাকে, জানতাম সে ডাক হয়তো পৌঁছতে পারবে না,
তবু থামি নি।ডেকেই গেছিলাম…।
আমি তোমায় ভালোবেসেছিলাম
যেভাবে শুকনো মাটিও বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে,আকাশ তাকে ভুলে গেলেও
সে কখনো ভুলে যায় না।
আজ মানুষের মন থেকে দরদ হারিয়ে গেছে – কারণ মানুষ ভয় পায় ভালোবাসলে হারাতে হয়,ভালোবাসলে কাঁদতে হয়, ভালোবাসলে নিজেকে উন্মুক্ত করতে হয়। মানুষ এখন নিজের ভাঙাচোরা অংশ কাউকে দেখাতে চায় না।
সবাই শক্ত মুখোশ পরে রাস্তায় হাঁটে, ভেতরে ভেতরে ফাঁকা হয়ে যায়।
তবু আমি জানি,এই ফাঁকা পৃথিবীতেও কোথাও না কোথাও একটা সত্যিকারের স্পন্দন বেঁচে আছে। কেউ না কেউ এখনো জানালার পর্দা সরিয়ে কারও পথচলা দেখে। কেউ না কেউ এখনো বুকের ভেতর একটা নাম গোপনে লালন করে।
তুমি যদি একবার বুকের ভেতর হাত রেখে বলো “না, ভালোবাসোনি” তবু আমি বিশ্বাস করবো না। কারণ ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি মিথ্যে হয় না।
সে হয়তো অসম্পূর্ণ হয়,অপ্রকাশিত হয়,
অস্বীকৃত হয়। কিন্তু থাকে।এই স্বার্থের পৃথিবীতে আমি এখনো ভালোবাসার পক্ষেই দাঁড়িয়ে আছি। কারণ লাভ-ক্ষতির অঙ্ক মিটে গেলে মানুষ যা খোঁজে,তা হলো একটুখানি স্পর্শ,একটু নিশ্চিন্ত শ্বাস,
একটা চোখ। যেখানে নিজের জন্য বিনা শর্তে জায়গা থাকে।
বলতে পারো, আমি বোকা।
বলতে পারো, আমি পুরোনো দিনের মানুষ। তবু আমি বিশ্বাস করি – যেদিন মানুষ আবার নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে শিখবে,সেদিন এই শহরের জানালাগুলো
আবার খুলে যাবে,পর্দা সরবে, মেলা থাকবে দুটি খোলে চোখের তৃস্নার্থ দৃষ্টি।
আরেকজন চলতে চলতে থমকে দাঁড়াবে পথের মাঝে শুধু কারও ভালোবাসা সত্যি ছিল বলেই তো!
( সমাপ্ত )
৪)
সুস্বাগতম ছাব্বিশ, ০২/০১/২০২৬
প্রবীর কুমার চৌধুরী
অবশেষে গেল বছরটা –
হৃদয়ের দেওয়ালের গায়ে রেখে গেল অনেক বেদনা, দুঃখ, হতাশা, বিফলতা। ঝরাল অনেক গ্যালন চোখের জল, অনেক কলঙ্ক,অনেক বিচার হল নিষ্ফল।
কত সতী হারালো ইজ্জত, কত প্রাণ ঝরে গেল অকালে। পথে, পথে ঘুরে বেড়ায় কত হাজারে, হাজারে ঘরহারা অসহায় মা – বাবা, বেআব্রু, উলঙ্গ হল সুসভ্য সময়ের ইতিহাস।
তাপসের সুন্দরী বৌটা আর ফেরেনি স্কুল থেকে। যে স্বাধীনভাবে স্বনির্ভর হয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। খুঁদ খুঁটে খাওয়া হরিবুড়ির দেহ পাওয়া গেল ভরা কোটালের জলের মধ্যে গলা কাটা অবস্থায়। এদানিং নাকি সে রাস্তা – ঘাটে, এখানে ওখানে কাদের বিরুদ্ধে কথা বলছিল। মনোজ সাউয়ের পাঁচবছরের মেয়েটাকে লজেন্স দেওয়ার নাম করে নিয়ে গিয়ে কে বা কারা যেন তার কচি, নরম যোনি ছিঁড়েছে। শিশুটা এখন মৃতপ্রায় হাসপাতালে।
ন্যাড়া বস্তির অভুক্ত বিধবাটা তার তিনবছরের রিকেট রুগীর মতো ক্ষুদার্থ ছেলেটাকে বুকে করে হঠাৎ দুইরাত বাইরে কাটিয়ে আজ সপরিবারে পাঁঠার মাংস দিয়ে সাদা চালের ভাত খাচ্ছে। আজ তার পরনে লালপেরে শাড়ি মুখে মধুর হাসি যেন কোনমন্ত্রবলে।
কিছুতেই ভোলা যায়না, মোছা যায়না মন থেকে কিছু, কিছু । ভীষণ ভাবায় – কোটি, কোটি টাকা চুরি করে কিছু মানুষ ঘুমায় কিভাবে। একটা বৌ থাকতেও কোন নেশায় আরেকটা মেয়েমানুষ নিয়ে নতুন অবৈধ সংসার পেতে কি করে জোর গলায় বলে – ” আজ আমায় বাতাসী ভীষণ সুখী করেছে “?
বিমলদের পুকুর বুজে আজ হাইরাইজ ফ্লাট। ওখানে পুকুর ধারে যে তিরিশ ঘরের লোক বাস করত তাঁরা আজ কোথায় কেউ খবর রাখেনি। এখনও কিছু, কিছু
তোবড়ানো অ্যালুমিনিয়মের বাসন, ভাঙ্গা আলনার কিছু পোড়া কাঠ, কিছু গরীব মায়ের, হাড়ভাঙ্গা খাটুনি বৌ, কিংবা সংসার স্বপনে মগ্ন উঠতি যুবতীর ছেঁড়া, ফাটা রঙচটা চুড়িদার ও ব্রার টুকরো, টাকড়া এখানে ওখানে লুটাচ্ছে। ঐ বস্তিতেই না কয়েকমাস আগে বিশাল অগ্নিকান্ড ঘটেছিল? দমকলের গাড়ি এসে কয়েকঘন্টায় চেষ্টায় আগুন নিভিয়েছিল। পরশুরামের চিরদুখী মা-টা পুড়ে ছাই হয়েছিল সে আগুনে। পুরুষরাম মায়ের প্রাণের বদলে টাকা পেয়ে, টাকা হাতে তৃপ্তির হাসি হেসেছিল। তার পাশে দাঁড়িয়েছিল পরশুর বৌ ও হাফডজন কুচো, কুচো ছেলেমেয়ে।
শুধু ভবা পাগলার কোন ভাবান্তর নেই। আজও সে বুড়ো বটতলায় বসে,বসে স্বপ্ন দেখে, গান গায়,নাক খোটে আর প্রানভরে মিটি, মিটি হাসে। আচ্ছা আজ কি ভবা ওর ধূর্ত প্রেমিকার কথা ভুলে গেছে। সায়েন্স মাস্টার্ড করা ভবপ্রসাদ ব্যানার্জীর সুন্দরী প্রেমিকা রত্নাবলি একদিন ডাক্তার বরের হাত ধরে চলে যাবার কয়েকমাসের মধ্যেই ভবপ্রসাদ ভবা পাগলা নামে খ্যাত হলো।…
ব্যানার্জী বাড়ির ছেলেরা কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল। তাঁরা ভবাকে কেউ ঘরে ডাকে না। হয়ত কেউ চিনতেই পারেনা। ভবা শুধু ভালোবাসতে চেয়ে আজ অদ্ভুদ এক দেবত্ব শক্তির অধিকারী।ভবার মধ্যে -খিদে নেই, তৃষ্ণা নেই, চাহিদা নেই, আকাঙ্খা নেই। সদাই উদাসী, বৈরাগ্য।
একটার পর একটা স্মৃতির পাতা উল্টায় অবসর । দগদগে ঘা করে দিয়ে নিষ্ঠুর বছরটা চলে গেল। কত বুকের অলিন্দে রক্তাক্ত ক্ষতও রেখে গেল। কত সিঁথির সিঁদুর মুছে দিয়ে গেল, কত অসহায় মায়ের কোল খালি করল। কত রাজাকে ভিক্ষারি করল আবার কত ভিখারিকে রাজা।
দূহাজার পঁচিশ এসেছে। কিছু কি পাওয়া যাবে নেজ্য অধিকার? পথের ধারে ঘামে ভেজা শরীরে, মোমবাতি হাতে করে অন্ধকার সরানোর অভিপ্রায়ে যাঁরা আজও ন্যস্ত দীর্ঘদিন। সব হারানোর ব্যথা বুকে অধীর জন্মদাতারা। যাঁরা একঠায় দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেই চলেছেন…।
কোন কিছু চাইতেই ভয় করে। স্বপ্নহীন,আশাহীন, প্রত্যাশাহীন এক জড়ভরৎ ম্যারম্যারে জীবণ।। শুধু প্রার্থনা থাক – আর যেন কোন কোল খালি না হয়, কোন সংসার না ভাঙে। সিঁদুর না মোছে সিঁথির।কোত্থাও না ভাঙে শাখা। আর যেন মাছি না বসে কারুর বাড়া ভাতে…।
শুভেচ্ছা ও শুভকামনায় সতত।
গড়িয়া, কোলকাতা






