John Gay (1685–1732)

John Gay (1685–1732)

 

John Gay (1685–1732)

John Gay (1685–1732)

অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে লন্ডনের বুর্জোয়া সমাজ ও নাগরিক জীবনকে কেন্দ্র করে এক নতুন ধরনের ব্যঙ্গাত্মক সাহিত্যের সূচনা হয়েছিল। সেই সময়ে একদল প্রতিভাবান লেখক সমবেত হয়ে একটি বিশেষ সাহিত্য চক্র গড়ে তোলেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সমকালীন পাণ্ডিত্যভিমান এবং সামাজিক ভণ্ডামিকে উপহাস করা। এই চক্রের সদস্যরা তৎকালীন প্রচলিত রোমান্টিক বা আদর্শবাদী ধারাকে ভেঙে বাস্তবতার রুঢ় রূপটিকে সাহিত্যের পাতায় তুলে আনতে চেয়েছিলেন। বিশেষ করে গ্রামীণ জীবনকে নিয়ে যে অতি-রোমান্টিক যাজকীয় বা পাস্টোরাল কবিতা লেখা হতো, সেই ধারার ভেতরে থাকা কৃত্রিমতাকে তারা তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। এই ভাবনার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে এক চমৎকার বিদ্রূপাত্মক ধারা, যা গ্রামীণ পটভূমিকে শহরের নোংরা ও জটিল গলিতে নামিয়ে আনে এবং এক অভিনব নাগরিক ছদ্ম-যাজকীয় কাব্যের জন্ম দেয়।

এই নতুন সাহিত্যিক ধারার অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি তাঁর ছান্দিক চমত্কারিত্ব এবং তীব্র তীক্ষ্ণ বিদ্রূপের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত লাভ করেন। তিনি গ্রামীণ রাখালিয়া কবিতার সনাতন কাঠামোটিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে লন্ডনের বাস্তব রাস্তার কোলাহল, পকেটমার, ভিখারি এবং অপরাধীদের জীবনকে কবিতার মূল উপজীব্য করে তোলেন। প্রচলিত ধারায় যেখানে রাখালদের প্রেম ও প্রকৃতির বন্দনা থাকত, তাঁর কলমে তা হয়ে উঠল শহরের অলির গলির বাস্তব চিত্রায়ণ। ছন্দ ও তালের ওপর অসাধারণ দখল থাকার কারণে তাঁর এই ব্যঙ্গাত্মক রচনাগুলো সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। গ্রামীণ সরলতার মুখোশ খুলে শহরের কদর্য রূপকে ছন্দোবদ্ধভাবে ফুটিয়ে তোলার এই বিশেষ কৌশলটি সমকালীন ইংরেজি সাহিত্যে এক চরম আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, যা পাঠককে একাধারে আনন্দ দিত এবং সমাজকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করত।

লন্ডনের এই বাস্তব চিত্রটিকে আরও নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি এক অভিনব কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে গ্রামীণ পঞ্জিকা বা রাখালদের সপ্তাহের দিনপঞ্জির আদলে শহরের জীবনকে ভাগ করা হয়েছিল। প্রচলিত যাজকীয় কবিতার যে ধ্রুপদী নিয়মাবলী ছিল, সেগুলোকে অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেও তিনি তার ভেতরের বিষয়বস্তুকে সম্পূর্ণ সস্তা ও বাস্তব উপাদানে ভরিয়ে দেন। এই বৈপরীত্যের ফলেই এক অদ্ভুত হাস্যরসের সৃষ্টি হয়, যা তৎকালীন কৃত্রিম সাহিত্য সংস্কৃতির গালে এক সজোরে চড় ছিল। কবিতার প্রতিটি চরণে ছিল চমৎকার ছন্দ ও সুরের খেলা, যা শহরের সাধারণ মেহনতি মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম ও নিম্নবিত্তের চালাকিগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছিল। এই বিদ্রূপাত্মক সৃষ্টিটি প্রমাণ করেছিল যে, গ্রামীণ রাখালদের কাল্পনিক কান্নাকাটির চেয়ে শহরের নোংরা গলির বাস্তব মানুষের গল্প অনেক বেশি জীবন্ত ও সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ হতে পারে।

কবিতার এই ছান্দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেবল গ্রামীণ জীবনের প্যারোডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা শহরের বুক চিরে হেঁটে চলার এক অদ্ভুত শিল্পকলায় রূপ ধারণ করেছিল। লন্ডনের রাস্তায় হাঁটার নিয়মাবলী এবং সেখানকার বিভিন্ন বিপদ-আপদকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘ বিবরণী মূলক কাব্য রচিত হয়, যা তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গণ্য হয়। এই রচনায় শহরের কাদা, বৃষ্টি, চোর-বাটপাড় এবং অভিজাতদের ভণ্ডামিকে অত্যন্ত চমৎকার ছন্দোবদ্ধ ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। ছন্দ ও অন্ত্যমিলের এমন সাবলীল ব্যবহার পাঠককে এক মোহময় অনুভূতির মধ্যে নিয়ে যেত, অথচ তার ভেতরে লুকিয়ে থাকত সমাজকে কাটার মতো ধারালো বিদ্রূপ। এই রচনাশৈলী নাগরিক জীবনের অন্ধকার দিকগুলোকে এক ধরণের নান্দনিক রূপ দিয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের যাপিত জীবনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

নাগরিক সমাজকে বিদ্রূপ করার এই প্রবণতা কেবল কবিতার পাতায় আটকে না থেকে খুব দ্রুত নাটকের মঞ্চে প্রবেশ করে এবং থিয়েটারের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটায়। সমকালীন ইতালীয় অপেরার যে অতি-নাটকীয় এবং কৃত্রিম উচ্চবিত্ত সুলভ ধারা লন্ডনের মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল, তার বিরুদ্ধে এক চরম প্রতিবাদ হিসেবে এক নতুন ধরনের গীতিনাট্য বা ব্যালাড অপেরা আত্মপ্রকাশ করে। এই নাটকে কোনো দেব-দেবী বা রাজকীয় চরিত্র ছিল না, বরং তার পরিবর্তে মঞ্চে স্থান পেয়েছিল চোর, ডাকাত, গণিকা এবং জেলের বন্দীরা। উচ্চাঙ্গ সংগীতের বদলে ব্যবহার করা হয়েছিল লন্ডনের প্রচলিত লোকপ্রিয় লোকসংগীতের সুর, যার সাথে যুক্ত হয়েছিল অত্যন্ত ধারালো ও চমত্কার রাজনৈতিক বিদ্রূপ। এই গীতিনাট্যটি মঞ্চস্থ হওয়ার সাথে সাথে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করে এবং অভিজাত সমাজের বিনোদনের চাবিকাঠিকে সাধারণ মানুষের নাগালে এনে দেয়।

এই যুগান্তকারী গীতিনাট্যের মূল শক্তির উৎস ছিল এর চমৎকার সুরের বাঁধন এবং সমাজের শীর্ষ স্তরের সাথে নিম্ন স্তরের অপরাধীদের এক সমান্তরাল তুলনা। নাটকের সংলাপে এবং গানে গানে দেখানো হয়েছিল যে, কারাগারের ভেতরের অপরাধীদের লোভ এবং ক্ষমতার লোভী রাজনীতিকদের চরিত্রের মধ্যে আসলে কোনো তফাত নেই। সমকালীন সরকারের দুর্নীতি এবং প্রধান মন্ত্রীর ক্ষমতার অপব্যবহারকে এতটাই সরাসরি আক্রমণ করা হয়েছিল যে, তা শাসকগোষ্ঠীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। চোর-ডাকাতদের মুখের ভাষা এবং তাদের জীবনযাত্রাকে এমন এক ছান্দিক ও বিদ্রূপাত্মক রূপ দেওয়া হয়েছিল, যা দর্শককে হাসাতে হাসাতে এক গভীর সামাজিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত। উচ্চবিত্তের নৈতিক পতনকে ফুটো করে দেওয়ার এই অভিনব নাট্যশৈলী তৎকালীন লন্ডনের থিয়েটার সংস্কৃতির মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়।

এই নাটকের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর এর দ্বিতীয় পর্ব বা সিক্যুয়েল যখন তৈরি করা হয়, তখন সরকারের তরফ থেকে তীব্র বাধা আসে এবং এর মঞ্চায়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কারণ এই নতুন পর্বে বিদ্রূপের তীর সরাসরি ঔপনিবেশিক দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের দিকে তাক করা হয়েছিল। যদিও মঞ্চে এই নাটকটি আলোর মুখ দেখতে পায়নি, তবুও বই আকারে এটি বাজারে আসার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে এর চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। পাঠক সমাজ বুঝতে পেরেছিল যে, এই নিষিদ্ধ রচনার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক পরম সত্য, যা শাসকেরা আড়াল করতে চাইছে। মঞ্চের আলো থেকে বঞ্চিত হলেও এই রচনাটি প্রমাণ করেছিল যে, কলমের ধারালো বিদ্রূপ এবং ছান্দিক শব্দের শক্তি যেকোনো স্বৈরাচারী রাজদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

নাটক ও কবিতার পাশাপাশি সাহিত্যের আরেকটি চিরাচরিত মাধ্যমকে এই ধারায় অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যা হলো পশুপাখির রূপক গল্প বা উপকথা। শিশুদের জন্য শিক্ষণীয় গল্পের ছদ্মবেশে পশুপাখিদের মুখ দিয়ে মানুষের সমাজের লোভ, ঈর্ষা, চাটুকারিতা এবং রাজনৈতিক কূটকৌশলকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আক্রমণ করা হয়েছিল। প্রতিটি উপকথা ছিল চমৎকার ছন্দোবদ্ধ এবং আট অক্ষরের চরণে বিন্যস্ত, যা খুব সহজেই মনে রাখা যেত এবং আবৃত্তি করা যেত। এই রূপক গল্পের আড়ালে আসলে রাজদরবারের ভেতরের নোংরা রাজনীতি এবং চাটুকারদের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও এই সৃষ্টিগুলো ছিল সমকালীন রাজকীয় ব্যবস্থার ওপর এক মৃদু কিন্তু গভীর ক্ষত সৃষ্টিকারী বিদ্রূপ, যা বুদ্ধিজীবী মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।

সমগ্র জীবনব্যাপী এই ধারার রচয়িতা যে সাহিত্যিক দর্শন লালন করেছিলেন, তা অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজকে এক নতুন দিশা দেখিয়েছিল। তাঁর কলম কখনো অন্যায়ের সাথে আপস করেনি, বরং হাস্যকৌতুক ও বিদ্রূপের মোড়কে সমাজকে বারবার তার নিজের আসল আয়নাটি দেখিয়েছে। শব্দের জাদুকরী ছন্দ এবং তালের মেলবন্ধনে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সমাজ সংস্কারের জন্য গম্ভীর উপদেশের চেয়ে চমত্কার কামড় দেওয়া বিদ্রূপ অনেক বেশি কার্যকর। গ্রামীণ শান্ত পরিবেশ থেকে শুরু করে লন্ডনের ব্যস্ত ও নোংরা রাজপথ—সবকিছুই তাঁর বিদ্রূপাত্মক দৃষ্টির সামনে এসে এক নতুন মাত্রা লাভ করেছিল। এই জীবনমুখী এবং তীক্ষ্ণ সাহিত্য শৈলী সমকালীন যুগের কৃত্রিমতাকে ভেঙে এক নতুন বাস্তবতাবাদী যুগের সূচনা করতে সাহায্য করেছিল।

লন্ডনের সাহিত্য পাড়ায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করে যখন এই মহান লেখনী চিরতরে থমকে যায়, তখন সমগ্র সাহিত্য সমাজ গভীর শোকে মগ্ন হয়েছিল। তাঁকে লন্ডনের বিখ্যাত এক ঐতিহাসিক উপাসনালয়ের কবি কর্নারে সমাধিস্থ করা হয়, যেখানে তাঁরই লেখা একটি বিখ্যাত পঙক্তি খোদাই করে দেওয়া হয়। সেই পঙক্তিতে বলা হয়েছিল যে, জীবন আসলে একটি তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়, যা তিনি আগে ভাবতেন এবং এখন নিশ্চিতভাবে জানেন। এই শেষ উক্তিটির মধ্যেও তাঁর সেই চিরপরিচিত বিদ্রূপাত্মক ও চমত্কার রসবোধ ফুটে উঠেছিল, যা মৃত্যুকেও এক ধরণের হালকা চালে গ্রহণ করতে শিখিয়েছিল। তাঁর রেখে যাওয়া এই ছান্দিক, কামড় দেওয়া এবং তীব্র বিদ্রূপাত্মক নাগরিক ছদ্ম-যাজকীয় ধারাটি পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

Post a Comment

© Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain