Sekhar Das

Sekhar Das

 

Sekhar Das
মানত
শেখর দাস


মহোৎসবের আলো ও এক উপেক্ষিত আঁধার
ত্রিবেনীর বিখ্যাত ডাকাতি কালী মন্দির আজ আলোয় আলোকময়। চারদিকের জমকালো আলোকসজ্জা আর সুগন্ধি ফুলের মালায় মন্দির প্রাঙ্গণ এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। চারদিকে উৎসবের আমেজ। বিড়ি ব্যবসায়ী রঞ্জিত সাহার অকৃপণ হাতের ছোঁয়ায় পূজোর আয়োজনে কোনো খামতি নেই। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী এবং এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে মন্দির চত্বর জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। এগারো জন নিষ্ঠাবান পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে মহাশক্তির আবাহনে ব্যস্ত। মন্দিরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন বটগাছটির তলায় বাঁধা রয়েছে উৎসর্গের জোড়া পাঁঠা—মায়ের চরণে বলি দেওয়া হবে তাদের।
এই বিপুল আয়োজনের নেপথ্যে রয়েছে দেড় বছর আগের এক ব্যাকুল প্রার্থনা। বিড়ি সেলার তপনের মুখে রঞ্জিত জানতে পেরেছিলেন এই ডাকাতি কালীর মহিমার কথা—মা নাকি অত্যন্ত জাগ্রত, ভক্তিভরে চাইলে মা কাউকে খালি হাতে ফেরান না। পরপর তিনটি কন্যাসন্তানের জন্ম হওয়ার পর রঞ্জিতের সংসার যখন এক পুত্রসন্তানের আশায় চাতকের মতো তৃষ্ণার্ত, তখনই রঞ্জিতের স্ত্রী পুনরায় অন্তঃসত্ত্বা হন। রঞ্জিত আর স্থির থাকতে পারেননি; ছুটে এসেছিলেন এই মন্দিরে। মায়ের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে সজল চোখে মান্নত করেছিলেন—যদি এবার তাঁর ঘরে আলো করে এক পুত্রসন্তান আসে, তবে তিনি সেই পুত্রের ওজনের সমপরিমাণ রুপোর গয়না মায়ের চরণে সঁপে দেবেন।
মা রঞ্জিতের ডাক শুনেছিলেন, মাত্র এক মাস আগে রঞ্জিতের স্ত্রী যমজ সন্তানের জন্ম দেন—একটি ফুটফুটে কন্যা আর একটি পুত্র। পুত্রলাভের আনন্দে আত্মহারা রঞ্জিত মনে মনে মা কালীকে কৃতজ্ঞতা জানান। কাঙ্ক্ষিত পুত্রের প্রতি অতিরিক্ত যত্ন, আদর আর অন্ধ মোহের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় একই সাথে পৃথিবীতে আসা নিষ্পাপ কন্যাটি। দিন দিন সে অবহেলার শিকার হতে থাকে। অবহেলার সেই তীব্র দহনে, অযত্নে ও অনাহারে অবোধ শিশুটি জন্ডিসে আক্রান্ত হয়। অবশেষে, জন্মের মাত্র তেরো দিনের মাথায়, এই নিষ্ঠুর ও চরম বৈষম্যমূলক পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে বিদায় নেয় সেই অবাঞ্ছিত কন্যাসন্তানটি।
আজ রঞ্জিত সাহার পুত্র রোহণের বয়স ঠিক একত্রিশ দিন। মান্নত ছিল পুত্রের ওজনের সমান গয়না দেবেন, কিন্তু আনন্দের আতিশয্যে রঞ্জিত আজ ছেলের ডবল ওজনের রুপোর গয়না দিয়ে মা কালীকে সাজিয়ে তুলেছেন। এই মহাপূজোর জাঁকজমক আর ধুমধাম দেখে উপস্থিত সকলেই ধন্য ধন্য করছেন। রঞ্জিত সাহার এই ভক্তি ও ঈশ্বরভীতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই।।

Post a Comment

© Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain