Subash Sarbabiddya

Subash Sarbabiddya

 

Subash Sarbabiddya
খুন
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা

ভদ্রমহিলার নাম শিউলি আক্তার। বিবাহিত। বয়স আটাশ উনত্রিশের এদিক-সেদিক। স্বামী,কর্মসূত্রে প্রবাসী। বিয়ের পর শিউলির বসবাস গ্রামে হলেও এখন শহরে স্থির হয়েছেন।
প্রায় দুই বছর হলো তিনি এই শহরে এসেছেন। সাথে রয়েছে তাঁর দশ বছরের মেয়ে তানিয়া।
তাঁদের এই ছোট্ট মেয়েটি একটি স্বনামধন্য ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।

শিউলি আক্তারের বিপরীতে স্ত্রী,ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকেন আরও একটি পরিবার। এই পরিবারের কর্তা হলেন মকবুল হোসেন আনসারী। তিনি মধ্য বয়সী। কাজ করেন একটি শিপিং কোম্পানিতে। তাঁর এক ছেলে,এক মেয়ে। ছেলে-মেয়ে দু’জনই সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে পড়ে। দুই পরিবার মোটামুটি সচ্ছল। একজন বিদেশী টাকায়। অন্যজন দেশীয় টাকায়। তবে,মকবুল সাহেব সচ্ছল হলেও মাঝে মাঝে কিছু কষ্টবোধ তাঁকে উসকে দেয়।

কারণ,তাঁর স্ত্রী নানা রোগে আক্রান্ত। তাঁকে নিয়ে দেশ-বিদেশও কম যাওয়া হয়নি। রেজাল্ট বরাবরের মতো জিরো।

অসুস্থতা নিয়ে কখনও-সখনও বউকে গাল-মন্দ করতে তিনি দ্বিধাবোধ করেন না-” আহারে! হেদিনও গর্ব করিয়া কইলেন,বাপ’র বাড়িত কতো সুন্দর সান্দর আছিলেন! কখনও কুনো রোগ বালাই আছিল না। আর এহন? কি দেখতাছি? এই বেডি-কথা কস্ না ক্যান,কি দেখতাছি? বাপ’র বাড়িত রোগ-বালাই জমাই রাখি,এহন আমার টাকার শারাদ্ধ (শ্রাদ্ধ)করতাছিস!”

মকবুল সাহেবের স্ত্রী এমনিতে নরম প্রকৃতির মেয়ে। প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে স্বামীর মন্দ কথা শুনলেও মুখ ভার করা ছাড়া তাঁর অন্যকোন গতি নেই।

মাঝে মাঝে ওই ভদ্রলোকের একটু স্বস্তি প্রয়োজন। স্বস্তি নিতে তিনি শিউলি আক্তারের বাসার ডোরবেলে চাপ দেন।
শিউলি আক্তার ডোর আই-এ চোখ রেখে দরজা খুলেন। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে এই ভদ্রলোককে ভিতরে ডেকে নেন। দু’জন চায়ের পেয়ালায় চুমুক রেখে সুখ-দুঃখের কথা শেয়ার করেন।
সেদিন কথাচ্ছলে শিউলি আক্তার একটি গোপন সমস্যার কথা মকবুল সাহবের সাথে শেয়ার করেন। ঔষধের দোকানে গেলে এই সমস্যাটি দ্রুত সমাধান হয়। কিন্তু শিউলি আক্তারের পক্ষে সেটি সম্ভব হচ্ছে না।

মকবুল সাহেব খানিক কী ভেবে বললেন-“ভাবী,আপনে হইলেন গিয়া আমাগো খু্ব আপনজন। বউয়ের পর অন্য কাউকে যদি এই মকবুল ভালোবাসে,সে হইলো আপনে। এ নিয়ে কুনো টেনশন নিয়েন না। কাইল অফিস ফিরতা হতেই আপনের লাগি নিয়া আসমু নে। দুইডায় খেইল খতম।
মকবুল সাহেব শিউলি অন্তপ্রাণ। তার নানা প্রয়োজনে তিনি নির্দ্বিধায় হাত বাড়িয়ে দেন।

পরদিন তাই হলো। অফিস থেকে আসার পথে দুটি “মেবেন ডিএক্স” কিনে শিউলি আক্তারের হাতে তুলে দিলেন। এবং খাওয়ার নিয়ম-কানুনও জানিয়ে দিলেন।এরপর কিছুদিন গড়িয়ে যায়।
অর্থাৎ বারোদিন পর মকবুল সাহেব আবারও ডোরবেলে চাপ মারেন। শিউলি আক্তার একই নিয়মে দরজা খুলেন। মনকাড়া হাসি দিয়ে বললেন-ভাইয়া,ভিতরে আইয়েন। আপনারে ধন্যবাদ দিবার ভুলি গেছি।

-ধন্যবাদ ক্যান?
-খেইল খতম তাই জন্য।
-কি বলেন?
-হ। হাঁছা কয়তাছি।
-মাত্র দশ টিঁয়ায় বেগ্গুন খুন!
-জি ভাইয়া।
কী এক প্রশান্তি মকবুল সাহেবের দেহ-মনে। বিড়বিড় করে বললেন, আইজ-কাইল দশ টিঁয়ায়ও খুন হয়!
হো হো হো করে তিনি হেসে উঠলেন। চায়ের ট্রে হাতে শিউলি আক্তার থমকে দাঁড়ায়।


২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ইং।



Subash Sarbabiddya
জিপিএ-3 উধাও
============
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা

রফিক সাহেব একজন ব্যবসায়ী। তাঁর কী ধরনের ব্যবসা অবৈধভাবে টাকা কামিয়ে বেশ ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন। শহরের এক প্রান্তে আরেকটি নতুন ফ্ল্যাট নিয়েছেন। নতুন বউ নিয়ে তিনি এই বাড়িতে থাকেন। তবে,অন্য দুই বউকেও তিনি অসুখে রাখেননি। তাদেরকেও দুইটি ফ্ল্যাট দিয়েছেন।

নতুন বউ জিপিএ-3 নিয়ে এবার এইচএসসি উর্ত্তীণ হলো। বউয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত সাফল্য! রফিক সাহেবের মনে ঈদ উৎসবের বন্যা। কারণ,তাঁর দৃষ্টিতে অন্য দুই বউ সুন্দরী বটে কিন্তু অকর্মার ঢেঁকি। লেখাপড়ারও ছিটে ফোঁটা নাই। তিন কেজি মিষ্টি কিনে তিনি বাসার পথে পা বাড়ালেন। মেইন গেইটের সামনে পৌছতেই তিনি প্রথম হোঁচটটি খেলেন। মেইন গেইট খোলা। আরেকটু সামনে এগিয়ে তিনি দ্বিতীয় হোঁচটটি খেলেন। দরজার মূল দরজা খোলা। নিচে পড়ে থাকে একটি চিরকুট। চিরকুটটি হাতে তুলে তিনি খানিক চোখ বুলিয়ে নিলেন। চোখ ওঠে কপালে। আলমারীর দিকে চোখ যেতেই তিনি তৃতীয় হোঁচটটি খেলেন। ছুটে যান আলমারীর কাছে। ত্রিশ ভরি স্বর্ণ উদাও।

এতোকিছুর পরও রফিক সাহেব মনোবল হারাননি। নিজেকে স্থির রেখে সালামকে ফোন দেন। সালাম তাঁর স্কুল বেলার বন্ধু। রফিক সাহেবের মুখে একটি দুঃখজনক সংবাদ শোনে সালাম সাহেব দ্রুত সময়ে ছুটে এলেন। ঘটনার আদ্যপ্রান্ত জেনে পরামর্শ দেন কালাম হুজুরের কাছে যেতে। কালাম হুজুর পাত্রে স্বচ্ছ পানির দিকে তাকিয়ে সবকিছু বলে দিতে পারেন। তাই হলো। সালামকে নিয়ে রফিক সাহেব গেলেন হুজুরের কাছে।

হুজুর প্রথম সম্মানী নেন ত্রিশ হাজার টাকা। এই টাকা তিনি নিজ হাতে নেন না। তাঁর একজন ক্যাশিয়ার রয়েছেন। ক্যাশিয়ার নগদ বুঝে পেলে একটি স্লিপ ধরিয়ে দেয়। এরপর হুজুুরের সাক্ষাত পান।
রফিক সাহেব স্লিপখানি হাতে নিয়ে হুজুরের সাক্ষাতপ্রার্থী হলেন। হুজুর খানিক পাত্রের দিকে তাকিয়ে রফিক সাহেবের দিকে দৃষ্টি দিলেন। হুজুরের চোখ জোড়ায় বিষ্ময়। বললেন-ভাইজান,কেইস জটিল।
-হুজুর বুঝি নাই। রফিক সাহেব বললেন।
-পঙ্খি উড়াল দিছে।

ভদ্রলোকের মেজাজ পৌছালো তিরিক্ষে। চেঁচিয়ে বললেন,ধুর মিয়া! এইসব আন্নে কিতা ক-অন? আঁর বউ পাখিনি? পাখি হয় যে উড়াল দিবো?
-ভাইজান,অতো চিল্লাইয়েন না। এগিন আঁর মুখর হতা নয়। আঁর হানি কয়তাছে,হেতি ম্যালা দূর উড়ি গেছে।
-হ! বুজ্জি। তো পাখি কতো দূর উড়ি গেছে?
-সোয়া তিনশো মাইল।

-ধুর মিয়া। আন্নে এইসব কিতা কঅন? হের মাথামুণ্ডু কিচ্ছু বুঝবার হারিনা। কাইল রেজাল্ট দিলো। বউডি আমার জিপিএ-3 পাইলো। আর আন্নে ক-অন….
হুজুর,আল্লাহ খোদার দোহায় লাগে। মনিকারে ছাড়া আঁই বাচুম না। হার্ট ইটাক হইবো মনে লয়। আন্নে আরেকখানা ভালা গরি চান।
-ভাইজান,বন্দুক’র গুলির মিস আছে। আঁর হানি হড়ার কুনো মিস নাই।

-হুজুর,ক্যানে বিশ্বাস করুম ক-অন? পড়শুদিন হেতে ঘরত আছিলো। একদিনের মধ্যে ক্যানে সোয়া তিনশো মাইল উড়ি যাইবো? হুজুর,আঁর মনে হইতাছে,আন্নের হানিপড়ায় ভুল হিসাব মারতাছে!
-না ভাইজান,না। আঁর হানি পড়া ঠিগাছে।
হুজুর তাঁর নিজ সিদ্ধান্তে অনঢ় রইলেন।
রফিক সাহেবের কোন যুক্তি ধোপে ঠিকলো না।

রফিক সাহেব নিরাশ হলেন। বন্ধু সালাম এবার পরামর্শ দিলেন। থানায় গিয়ে একটি জিডি করতে। ভদ্রলোক ছুটে গেলেন থানায়। জিডি হলো। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্দেশ দিলেন, পত্রিকায় একটি ’হারানো বিজ্ঞপ্তি’ দিতে। এবার ছুটে গেলেন তিনি পত্রিকা অফিসে। পত্রিকার বিজ্ঞাপণ গ্রহিতা রফিক সাহেবের বিজ্ঞপ্তিখানি সাজিয়ে নিলেন। উপরে লিখলেন ’হারানো বিজ্ঞপ্তি’।
উপরের লেখাখানি রফিক সাহেবের মনে ধরলো না। তিনি নাখোশ হলেন। বললেন,ভাই উপরের হেডিং চেঞ্জ করান লাগব।

-কেন কি সমস্যা? বিজ্ঞাপন গ্রহীতা বললেন।
-সমস্যা আপনের নয়। আমার জীবন-মরন সমস্যা।
এখানে লেখেন ”জিপিএ- 3 উধাও”।
বিজ্ঞাপন গ্রহিতা মুচকি হেসে বললেন-স্যার,পত্রিকায় ’হারানো বিজ্ঞপ্তি’ এইভাবে যায় না। রফিক সাহেব এবার চেঁচিয়ে উঠলেন। বললেন-দূর মিয়া,টিঁয়া খরচ করুম আঁই। আন্নের কিল্লাই এত মাথা ব্যথা হর? আন্নেরে যা কইতাছি,তা-ই লিখেন।
অবশেষে বিজ্ঞাপন গ্রহিতা ভদ্রলোকের কথা মেনে তাই করলেন-লিখলেন,জিপিএ-3 উদাও।


০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইং

Post a Comment

© Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain