John Hookham Frere (1769–1846)
জন হুকাম ফ্রেয়ার ছিলেন আঠারো শতকের শেষভাগে জন্ম নেওয়া এক অনন্য ইংরেজ কূটনীতিবিদ ও লেখক, যার সাহিত্যিক অবদান ইংরেজি কাব্যের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল। কেমব্রিজে পড়ার সময় থেকেই তার মেধার পরিচয় পাওয়া যায় এবং পরবর্তীতে তিনি ব্রিটিশ সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে কূটনৈতিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও সাহিত্যের প্রতি তার গভীর অনুরাগ কমেনি, যা তাকে সমসাময়িক লেখকদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল। বিশেষ করে স্পেনে ব্রিটিশ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ইতালীয় সাহিত্যের সংস্পর্শে আসেন, যা তার পরবর্তী সৃষ্টিশীল কাজের প্রধান অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।
স্পেনের মাটিতে বসেই ফ্রেয়ার ইতালীয় সাহিত্যের এক অসাধারণ ও রসাত্মক কাব্যশৈলী আবিষ্কার করেন, যা তখন পর্যন্ত ইংরেজি সাহিত্যে প্রায় অজানাই ছিল। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের ইতালীয় কবিদের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই বিশেষ ছন্দটি ছিল মূলত বীরত্বগাথা লেখার জন্য ব্যবহৃত এক শক্তিশালী মাধ্যম। ফ্রেয়ার লক্ষ্য করলেন যে এই গাম্ভীর্যপূর্ণ ছন্দকে যদি কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে তা ব্যঙ্গাত্মক রচনার জন্য এক দারুণ হাতিয়ার হতে পারে। এই ভাবনাই তাকে ইংরেজি সাহিত্যে এক সম্পূর্ণ নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সাহসী অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
ইতালীয় সাহিত্যের সেই বিশেষ ছন্দটি আর কিছুই নয়, বরং বিখ্যাত ওত্তাভা রিমা বা আট লাইনের স্তবক পদ্ধতি, যা প্রতিটি লাইনে নির্দিষ্ট মাত্রার বিন্যাস মেনে চলে। ফ্রেয়ার এই ছন্দকে ইংরেজিতে রূপান্তর করার সময় তার কাঠামোগত সৌন্দর্যকে অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং প্রতিটি স্তবকে একটি নির্দিষ্ট অন্ত্যমিল বা রাইম স্কিম বজায় রাখার ব্যবস্থা করেন। তার এই নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই ইংরেজি কবিতার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইতালীয় ওত্তাভা রিমা তার নিজস্ব রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এই ছন্দটি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের প্রকাশের ক্ষমতাকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ছন্দের এই নতুন রূপকে ফ্রেয়ার শুধু অনুবাদ বা অনুকরণে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং একে যুক্ত করেছিলেন মক-হিরোইক বা কৃত্রিম বীরত্বগাথার এক অনন্য আঙ্গিকের সাথে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই গাম্ভীর্যপূর্ণ ছন্দের মোড়কে অতি সাধারণ বা তুচ্ছ বিষয়কে উপস্থাপন করলে এক অদ্ভুত ও চমৎকার হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। এই কৌশল ব্যবহার করে তিনি সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতির নানা অসঙ্গতিকে অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে ব্যঙ্গ করতে শুরু করেন। ফ্রেয়ারের এই নতুন ঘরানার লেখাগুলো ইংরেজি ব্যঙ্গাত্মক সাহিত্যের জগতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিল।
ফ্রেয়ারের এই অভিনব সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সবচেয়ে সার্থক ও উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে ওঠে তার ছদ্মনামে প্রকাশিত বিখ্যাত গ্রন্থ হোয়িসেলক্রাফট। এই কাব্যে তিনি আর্থারীয় যুগের কিংবদন্তিকে ওত্তাভা রিমা ছন্দের মাধ্যমে অত্যন্ত রসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মকভাবে ফুটিয়ে তোলেন, যা তৎকালীন পাঠক ও সমালোচকদের চমকে দিয়েছিল। গুরুগম্ভীর বীরত্বের কাহিনীর আড়ালে লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম কৌতুক ও সামাজিক সমালোচনা বইটিকে দারুণ জনপ্রিয় করে তোলে। এই প্রকাশনাটি কেবল ফ্রেয়ারের নিজস্ব পরিচিতিই বাড়ায়নি, বরং ইংরেজি কাব্যের জগতে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
হোয়িসেলক্রাফট বইটি প্রকাশের পর তা সমসাময়িক তরুণ ও প্রতিভাবান কবিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বিন্দুমাত্র সময় নেয়নি। বিশেষ করে তৎকালীন রোমান্টিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পুরোধা ব্যক্তিত্ব লর্ড বায়রন এই নতুন কাব্যশৈলী দেখে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। বায়রন তখন তার নিজস্ব লেখার জন্য এমন একটি মাধ্যমের সন্ধান করছিলেন, যা একই সাথে তরল, চটুল এবং গভীর সামাজিক বার্তা দিতে সক্ষম। ফ্রেয়ারের উদ্ভাবিত এই কৃত্রিম বীরত্বগাথার শৈলী ও ওত্তাভা রিমা ছন্দের মেলবন্ধন বায়রনের সেই দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটায়।
ফ্রেয়ারের দেখানো এই নতুন পথ ও ছন্দের কৌশলকে অবলম্বন করেই লর্ড বায়রন তার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ও কালজয়ী মহাকাব্য ডন জুয়ান রচনায় হাত দেন। ফ্রেয়ারের হোয়িসেলক্রাফট যদি না থাকত, তবে বায়রনের পক্ষে ডন জুয়ানের মতো এমন ধারাভাষ্যমূলক ও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক সৃষ্টি করা হয়তো কখনোই সম্ভব হতো না। বায়রন নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে ফ্রেয়ারের ছন্দ বিন্যাস এবং লেখার ভঙ্গিই তাকে এই বিশাল সৃষ্টির পেছনে সবচেয়ে বড় গাইড বা নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে ফ্রেয়ারের সাহিত্যিক অবদান বায়রনের লেখনীর মাধ্যমে এক অমর রূপ লাভ করে।
লর্ড বায়রনের ডন জুয়ান কাব্যগ্রন্থে ফ্রেয়ারের সেই ইতালীয় ওত্তাভা রিমা ছন্দ কেবল ব্যবহৃতই হয়নি, বরং তা ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে ব্যঙ্গ ও কৌতুকের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে। বায়রন ফ্রেয়ারের প্রবর্তিত সেই আট লাইনের স্তবক কাঠামোকে এতটাই নিখুঁতভাবে কাজে লাগান যে, তা ইংরেজি সাহিত্যের একটি স্থায়ী সম্পদে পরিণত হয়। সমাজ, রাজনীতি এবং মানুষের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে বায়রনের যে ক্ষুরধার লেখনী, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল ফ্রেয়ারের দেওয়া সেই ছন্দের স্বাধীনতা ও সাবলীলতা। এই যুগান্তকারী সৃষ্টি ফ্রেয়ারের দূরদর্শিতাকেই বারবার প্রমাণ করে।
সাহিত্যের এই বিশাল রূপান্তরের পেছনে জন হুকাম ফ্রেয়ারের ভূমিকা কেবল একজন কবি বা অনুবাদক হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি ছিলেন একজন নীরব পথপ্রদর্শক। তিনি নিজে হয়তো বায়রনের মতো বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাননি, কিন্তু বায়রনের মতো এক মহান কবিকে সঠিক পথ দেখিয়ে তিনি ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। ছন্দের জগতে তার এই নীরব বিপ্লব ব্যঙ্গাত্মক কবিতাকে এক নতুন মর্যাদা ও গাম্ভীর্য দান করেছিল, যা পরবর্তী প্রজন্মের বহু কবিকে অনুপ্রাণিত করে। তার এই দিকনির্দেশনা ছাড়া ইংরেজি রোমান্টিক যুগের ব্যঙ্গসাহিত্যের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা ইংরেজি সাহিত্যের সোনালী দিনগুলোর দিকে তাকাই, তখন ফ্রেয়ারের প্রবর্তিত সেই ওত্তাভা রিমা ছন্দের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৭৬৯ সালে জন্ম নেওয়া এবং ১৮৪৬ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া এই দূরদর্শী মানুষটি ইংরেজি ব্যঙ্গসাহিত্যের যে ভিত গড়ে দিয়েছিলেন, তা আজও অম্লান। বায়রনের মতো শ্রেষ্ঠ কবিকে পথ দেখানোর মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্যের ইতিহাসে নিজের নাম চিরকালের জন্য খোদাই করে গেছেন। জন হুকাম ফ্রেয়ার তাই কেবল একজন কূটনীতিবিদ বা লেখক নন, বরং তিনি ইংরেজি কাব্যজগতের এক কালজয়ী ও অবিস্মরণীয় রূপকার।
