ACHINTYA KABIRAJ

ACHINTYA KABIRAJ

 

ঘড়ি

অচিন্ত্য কবিরাজ

আশা লতা দেবী তার পুরনো আলমারি থেকে একটা বন্ধ হাতঘড়ি বের করে নাতি শুভকে ডেকে বললেন
– ভাই, আমার একটা কাজ করে দিবি? – বল। কি কাজ।
হাত ঘড়িটা শুভর চোখের সামনে তুলে ধরে বললেন – এই ঘড়িটা…….
শুভ ঘড়িটা দেখেই চিনতে পারল। শুভ জানে এর আগে ঠাকুমা আশালতা দেবী বার পাঁচেক বাবাকে এই ঘড়িটা দেখিয়েছেন।

– ঠাকুমা, আবার তোমার মাথায় ঘড়ির ভূত চেপে বসলো!এর আগেও তো ঘড়িটা বাবাকে দিয়েছিলে।শুনেছো তো,সব দোকানের মিস্ত্রীরা বলেছে এই ঘড়ি সারানো যাবে না। এত পুরনো ঘড়ির স্পেয়ার পার্টস এখন আর পাওয়া যায় না। এই অচল ঘড়িটা কে কেন সচল করতে চাইছো সেটাইতো বুঝতে পারছিনা। এখন তো কত সুন্দর সুন্দর ঘড়ি পাওয়া যায়। তাছাড়া তুমি তো সারাদিন ঘরেই থাকো। তাহলে তোমার ঘড়ির কি দরকার!

– তোর বয়স কম তাই তুই বুঝতে পারছিস না। আমাকে ভুল বুঝিস না ভাই। তুই বড় হলে সব বুঝতে পারবি। প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু ঘটনা থাকে যা তার একান্তই নিজস্ব। এই ঘড়িটাও তেমনি এক ঘটনার সাক্ষী। জানিস দাদু ভাই, এই ঘড়িটা তোর ঠাকুরদাকে ওনার জন্মদিনে আমি উপহার দিয়েছিলাম। উনি ও এই ঘড়িটা খুব পছন্দ করতেন। সংসার খরচ থেকে বাঁচিয়ে এই ঘড়িটা কিনেছিলাম। আমাদের সময় তো আর তোদের মত জন্মদিনে এত হইহুল্লোড় , কেক কাটা এসব ছিল না। বড়জোর একটু পায়েস করা, কিছু হাতে তৈরি মিষ্টি আর সামর্থ মত কিছু উপহার দেওয়া। তবে কি জানিস ভাই তখন সম্পর্কগুলো এখনকার মত এত আলগা ছিল না। আমাদের সময়ে ছিল সব একান্নবর্তী পরিবার। মা-বাবা ঠাকুমা, দাদু পিসিমা, কাকা কাকিমা, দাদা দিদি ভাই বোন নিয়ে ভরা সংসার। আর এখন পরিবার ছোট হতে হতে তলানিতে এসেছে ঠেকেছে।

 এখনকার ছেলেমেয়েরা সম্পর্কগুলো বইয়ের পাতায় মুখস্থ করে। এখন সংসার বলতে তো বড়জোর তিনজন। স্বামী-স্ত্রী আর সন্তান। এই তিন জনের মধ্যে আবার কত দূরত্ব। যেন কেউ কাউকে চেনে না। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মিল নেই, মায়ের সাথে মেয়ের মিল নেই ,ছেলের সাথে বাবারও ওই একই অবস্থা। মনে হয় যেন সবকিছু কৃত্রিম। যেন জোর করে আমরা সম্পর্কগুলোকে টিকিয়ে রেখেছি। আজ আমরা নিজেদের টুকু ছাড়া কিছু বুঝিনা। নিজেকে নিয়ে আমরা এত ব্যস্ত যে অন্য কারো কথা ভাববার অবকাশ নেই। কিন্তু আমাদের সময়ে তেমনটি ছিল না। এই নষ্ট ঘড়িটার কোন মূল্য হয়তো তোদের কাছে নেই। ওটা তোদের কাছে একটা জঞ্জাল ছাড়া কিছু নয়। এই ঘড়ির সাথে তোর ঠাকুরদার স্পর্শ লেগে আছে। তোর ঠাকুরদা আজ নেই তবু এই ঘড়ির মধ্যে আমি তাঁকে খুঁজে পাই। আর যে কটা দিন বেঁচে আছি, তোর ঠাকুরদার স্মৃতি নিয়ে বাঁচতে চাই।
শুভ বুঝতে পারে এই নষ্ট ঘড়িটা ঠাকুমার কতখানি হৃদয় জুড়ে আছে।

– ঠাকুমা তুমি ঠাকুরদাকে খুব ভালোবাসতে তাই না?
– সেটা কি মুখ ফুটে বলতে হয় ভাই। তোর যখন বিয়ে হবে তখন তুইও আমার দিদিভাইকে ভীষণ ভালবাসবি। তবে একটা কথা মনে রাখিস, দিদিভাইকে পেয়ে কিন্তু তোর বাবা মায়ের কথা ভুলে যাস না ভাই।
শুভ ঠাকুমার কথা শুনতে শুনতে অবাক বিস্ময়ে ঠাকুরমার দিকে তাকিয়ে থাকে। একটা মানুষকে কতখানি ভালবাসলে মৃত্যুর এতদিন পরেও এভাবে ভালোবাসা যায়। একদিকে ঠাকুমাকে দেখে অন্যদিকে বাবা মাকে দেখে, কোনো মিল খুঁজে পায় না শুভ। এখনই বাবা-মায়ের প্রায়ই অশান্তি লেগেই থাকে। মৃত্যুর পর কে কাকে কদিন মনে রাখবে সেই ভেবে অবাক হয়।

– কি হলো দাদুভাই, কি অত ভাবছিস?
– না কিছু না। কই দাও তো ঘড়িটা, একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি।
– সত্যি নিয়ে যাবি ভাই!
– হ্যাঁ সত্যি নিয়ে যাব।
শুভ লক্ষ্য করে ঠাকুমার ঘোলা চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। যে মানুষটা জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কেবলমাত্র স্বামীর স্মৃতি নিয়ে বাঁচতে চাই সেই মানুষটাকে একটু শান্তি দিতে পেরে বেশ তৃপ্তি অনুভব করে শুভ ।

Post a Comment

© Article and Story. All rights reserved. Developed by Jago Desain